বাংলাদেশীদের দেশান্তরী হয়ে অন্য দেশে বসতি গড়ার পথটা কিন্তু বাতলে দিয়েছিলেন সিলেটিরাই, এ বিষয়ে খুব কম সংখ্যক মানুষই বিতর্কে জড়াবে ! বৃটিশ আমল থেকেই সিলেটীদের বিলেত যাত্রার প্রারম্ভিকা ! সিলেটের প্রথম কালেক্টর রবার্ট লিন্ডসের আত্মজীবনী থেকে জানা যায় সিলেটের ছৈদ উল্লাহ নামক এক ব্যক্তি প্রথম বিলেত গিয়েছিলেন !
প্রখ্যাত লেখক গবেষক নুরুল ইসলাম তাঁর ” প্রবাসীর কথা ” (অখন্ড) বইয়ে বলেছেন সিলেটের জাহাজীরাই প্রথম প্রবাসী বা প্রবাসী বাঙালীদের পথিকৃৎ। গবেষক গোলাম মুরশিদের বইয়ে আব্দুল্লাহ নামক এক বাঙালি বিলেত যাত্রীর নাম উঠে এসেছে।
১৮৫৬ সালে সিলেটে বাণিজ্যিকভাবে চায়ের চাষ শুরু হয়, তখন চা রপ্তানির জন্যে ইন্জিন চালিত জাহাজ কোম্পানীগুলো খালাসী ও লস্কর হিসেবে চাকুরী দিত সিলেটীদের ! ভয়াবহ গরমের মধ্যে বয়লারে কয়লা দেয়ার কাজ অনেক কম পারিশ্রমিকের বিনিময়ে সিলেটীরা করতেন যেখানে শেতাঙ্গদের নিয়োগ করলে অনেক বেশী পারিশ্রমিক দিতে হত।
এ খালাসী এবং লস্করেরা প্রথমে আসতেন কলকাতায় তারপর লন্ডন, তাদের মধ্যে কেউ কেউ সেখানে থেকে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। পরবর্তীতে তাদের কাজের পরিধি বিস্তৃত করেন রেস্টুরেন্টে কাজ করার মধ্য দিয়ে। মোদ্দাকথা আলোচনা পর্যালোচনার পরে সিলেটীরাই যে ভারতীয় উপমহাদেশ তথা বিশেষ করে বাঙালিদের দেশান্তরী হওয়ার অগ্রপথিক সেটা মোটামুটি প্রতিষ্ঠিত সত্য।
বৃটিশ পরবর্তী পাকিস্তান আমল থেকে ব্যাপক হারে সিলেটীদের বিলেত যাত্রা শুরু হয় ! প্রথম প্রজন্মের বিলেত যাত্রীরা মুলত ছিলেন শিক্ষা দীক্ষায় পিছিয়ে পড়াদের একটা বিরাট অংশ, একেবারে খেটে খাওয়া শ্রেনীর প্রতিনিধি, যারা ছিলেন শারীরিক শ্রম নির্ভর ! ঐ সময়ে আবার কেউ কেউ আমেরিকায়ও গিয়েছিলেন।
বাংলাদেশ আমলের শুরু থেকে নব্বই দশকের মাঝামাঝি পর্যন্ত ঐ শ্রেনীর মানুষজন মুলত ইউরোপ আমেরিকায় দেশান্তরী হয়েছেন, যাদের আসলে দেশে কিছু করার ছিলনা, অর্থাৎ মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তানেরা, যারা ছিল সংসারে কম গুরুত্বপূর্ণ, যারা তেমন একটা লেখাপড়া করেনি, আবার ব্যবসা বাণিজ্যেও সুবিধা করার মত অবস্থানে ছিলনা !
নব্বইয়ের শেষের দিক থেকে এই শতকের প্রথম দশকে সংসার কিংবা পাড়া মহল্লার সেরারাই উল্লেখযোগ্য হারে বিদেশ মুখী হয়েছে, যারা মেধায়, চিন্তায়, চেতনায় সেরা ! এমনকি অনেকেই দেশ ছেড়েছে, যাদের দেশে একটা ভাল অবস্থান ছিল, প্রতিষ্ঠিতও ছিল।
আর এখন তো চলছে সেরা থেকে সেরাদের বিদেশ গমন, বিশেষ করে ইউরোপ আমেরিকা সহ উন্নত বিশ্বে, আর সেটা যেকোন মুল্যের বিনিময়ে হলেও। প্রথম আর দ্বিতীয় ধাপে মানুষের বিদেশ প্রীতি ছিল অনেকটাই আর্থিক প্রয়োজনে আর বর্তমানে আর্থিক এবং নিরাপত্তার প্রশ্নে ।
বর্তমানে শুধু সিলেটী অথবা যুব সমাজই কেবল নয় বরং সারাদেশের সকল শ্রেণী ও বয়সের মানুষই বিদেশের নামে মরিয়া, এমন এমন প্রতিষ্ঠিত ব্যক্তিবর্গ আছেন, দেশে যাদের আর্থিক অবস্থান এমন পর্যায়ে রয়েছে যে তাদের পরবর্তী দু তিন প্রজন্মেরও অর্থনৈতিক সমস্যার মুখোমুখি হতে হবেনা, তারাও এখন উন্নত বিশ্বের একটা রেসিডেন্সীর জন্যে অন্তপ্রাণ।
এরকম ধারাবাহিক পরিক্রমায় দেশ ও জাতি দিন দিন মেধাশুন্য হয়ে পড়ছে, বোধশক্তির পশ্চাতগামিতা চুড়ান্তভাবে পরিলক্ষিত হচ্ছে — মেধাহীন ব্যক্তি, সমাজ কিংবা জাতি পদে পদে ভুল করবে, সামান্য বিষয়ে মারামারি, হানাহানি করবে, মেধাবী আর যোগ্যদের অবমুল্যায়ন করবে, এটাই অতি স্বাভাবিক।
আর এরকম ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ কিংবা দেশকে অন্য কারও মাধ্যমে ধ্বংস করার প্রয়োজন হয়না বরং তারা নিজেরাই নিজেদেরকে ধ্বংস করার জন্য যথেষ্ট।।
