প্রত্যেকের জীবন অনেক ঘটনার সাক্ষী হয়ে থাকে। অনেক সময় লজ্জা শরমের বালাই না করে নির্দ্বিধায় কেউ বলতে পারে, আবার কেউ বলতে পারে না। আমার জীবনের অনেক কিছু যাহা বন্ধুবান্ধব জানেন না তাদেরকে জানিয়ে দেই। অভাব-অনটন প্রত্যেক পরিবারের মধ্যে ছিল এবং থাকবে আগামীতে। অভাব শব্দের অর্থ অনেক ব্যাপক। যে কোটিপতি মিলিয়নিয়ার তারও জীবনে অভাব রয়েছে।
যে সালের কথা বলছি দেশ স্বাধীন হবার তিন বছর পরের। সদ্য স্বাধীন প্রাপ্ত বাংলাদেশে খাদ্যের অভাব। তারমধ্যে বিশেষ করে চাউলের। যত বড় বাড়িতে থাকেন না কেন পেটে কোন কিছু না দিলে হয় না। পাকস্থলী শূন্য রেখে বিছানায় গেলেও ঘুম তো আসবে না। এপাশ-অপাশ করে কেটে যাবে সারা রাত। যারা শহরে বসবাস করতেন তাদের জন্য অনেক কষ্টকর দিন ছিল। শহরের বাড়ি ছাড়া অন্য কোথাও দ্বিতীয় আবাসস্থল নাই। এমনই পরিবারের ছেলে আমি একজন।
সিলেট গভর্ণমেন্ট পাইলট স্কুলের ছাত্র। দেশে যেমন অরাজকতা ছিল, তার সাথে ছিল খাদ্যের অভাব। রেশন কার্ডের মাধ্যমে চাউল, গম ,লবণ ,চিনি, বাটার যাহা পাওয়া যেত তা আটজন সদস্য পরিবারের জন্য পর্যাপ্ত ছিল না। সবার মনের মধ্যে একটা ভয়ঙ্কর বিস্তার লাভ করছিল তখন। কি হবে আগামীতে।
তখন সিলেট শহরে অনেক জায়গায় মাথাপিছু ৫ সের করে চাউল ন্যায্যমূল্যে বিক্রি করার ব্যবস্থা করে সরকার। এমন এক সময় খাদ্যের অভাব দেখা দিল তখন পবিত্র মাহে রমজান মাস। খোঁজ পাওয়া গেল( কালীঘাটের) ছড়ার পারের একটা রাইস মিলে ন্যায্যমূল্যে ৫ সের করে চাউল দিবে। সিদ্ধান্ত নেয়া হলো আমি আর বড় ভাই সেহরি খেয়ে চলে যাব সেই ন্যায্যমূল্যে চাউল বিতরণের জায়গায়।
আমাদের বাড়ি থেকে প্রায় তিন মাইল দূরে সেই জায়গাটা। যত আগে যেতে পারা যাবে ততো আগে চাউল নিয়ে বাড়িতে ফিরে আসব। ঠিকই সূর্য উঠার সাথে সাথে সেখানে গিয়ে লাইনে দাঁড়ালাম। লম্বা লাইন প্রায় ৪০০ জনের পিছনে আমরা। দেখতে পাচ্ছি সবাই হাসিমুখে চাউল নিয়ে যাচ্ছে। মনে অনেক ফুর্তি আমরাও নিয়ে যাব এরকম হাসি মুখ করে। দুই দুইটা দরজা দিয়ে রশিদ সহকারে বিক্রি করছে।
সকাল থেকে দুপুর গড়িয়ে গেল এখনো আমরা অনেক পিছনে। মসজিদে আসরের নামাজের আজান হচ্ছে মাইকে। যতটুকু মনে পড়ে সেদিন আমরা রোজা রাখি নাই। আসরের পর ঘনিয়ে আসলো সন্ধ্যা। আমরা যখন দুয়ারের সামনে এসে পৌঁছে গেলাম, তখন আমাদের সামনে মাত্র ৩-৪ জন লোক ছিল। এমন এক সময় দুয়ারের সামনে দাঁড়িয়ে ঘোষণা করল আজকের জন্য বন্ধ । তখন হৃদয়ে অনেক কান্না আর রাগে আঘাত করল। দুজনের মলিন মুখ নিয়ে ছড়ার পার থেকে হেঁটে হেঁটে রওয়ানা দিলাম বাড়ির অভিমুখে।
মা তখন আমাদের অপেক্ষা করতে করতে রিক্সা যোগে রওয়ানা দিলেন আমাদের খুঁজে। আমরা যখন মহাজনপট্টি গলিতে তখন হঠাৎ করে কানে ভেসে উঠে মায়ের কন্ঠ। রিক্সা থামিয়ে দুই ভাই ঝটপট করে উঠে রিক্সায় চড়ে বসলাম। আমাদের হাত খালি দেখে মা কোন কিছু জিজ্ঞেস করেন নাই। শুধু বুকে জড়িয়ে আদর করতে লাগলেন।
“ন্যায্য মূল্যে কাপড় খরিদ”
সিলেট শহরের অনেক জায়গায় ‘ কসকর ‘ নামে ন্যায্য মূল্যের দোকান ছিল। সম্ভবত এসব দোকান ১৯৭৭ সাল পর্যন্ত চালু ছিল। জানি না কেন এসব দোকান শেষ পর্যন্ত বন্ধ হয়ে গেল! যাদের আয় লিমিটেড ছিল তাদের জন্য এসব দোকান খুবই পছন্দের। একটা দোকান ছিল সোবহানী ঘাটে (যতরপুর), আরেকটা ছিল জিন্দাবাজারের মাতৃমঙ্গল হাসপাতালে উল্টোদিকে। লম্বা বিল্ডিংটা ছিল দুতলা। অর্থাৎ মহিলা কলেজের লাইনে। সিঁড়ি দিয়ে দু তলায় উঠার পর বামে ছিল দোকান কোটা ‘কসকর’। জীবনে অনেক কিছুর জন্য লাইনে দাঁড়িয়ে ছিলাম।
” পিঁয়াজ সংকট ২০১৯ সাল”
এখন আমি আমেরিকার লস অ্যাঞ্জেলেস শহরে। চোখের সামনে ভেসে উঠলো আমার অতীত। পিঁয়াজ নিয়ে সরকারের মন্ত্রীদের হাস্যকর মন্তব্য শুনলেন ১৯ কুটি জনতা। কতটুকু সত্য, কতটুকু মিথ্যা হাস্যকর মন্তব্যটুকু সেটা একমাত্র অন্তর্যামী জানেন। ভাবতে অবাক লাগে পেঁয়াজ ছাড়া ২২ রকমের রান্না আমাদের খাদ্য মন্ত্রী জানেন! ভাবলাম খাদ্যমন্ত্রী পেঁয়াজ সংকট এর আগে যদি একটা স্কুল খুলে নিতেন মন্দ হতো না। জনগণ এত হতাশ হবার কথা ছিল না।
উল্লেখ্য সিলেটের মেয়র আরিফ ১০ জন নাগরিকের মত লাইনে দাঁড়িয়েছিলেন। তখন অনেকের কাছে অন্যরকম মনে হয়েছিল। হ্যাঁ আরিফ একজন মেয়র। আবার বর্তমান সরকারের বিরোধীদলের সিলেটের কৃতি সন্তান। আরিফ কে নিয়ে আমার বেশি কোন কিছু বলার অবকাশ নাই। এইডেড হাই স্কুলে থাকতে এক সময় ট্রাফিক সপ্তাহ উদযাপন হতো সিলেট শহরে। তখন আমরা একসাথে ডিউটি করেছি।
আজ আমি যদি দেশে থাকতাম তাহলে আমি ও মেয়র আরিফের মতো লাইনে দাঁড়িয়ে রান্না করার পেঁয়াজ নিয়ে আসতাম। ব্যাগ ভরা পেঁয়াজ ঘরে না নিয়ে আসলেও সেই পেঁয়াজ গুলো সমাজের দরিদ্র, অথবা যাদের লাইনে দাঁড়ানোর শারীরিক ক্ষমতা নাই তাদের কাছে বিলিয়ে দিতাম।
