বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর প্রথম অফিসার ব্যাচের গল্প – ইউসুফ জুলকারনাইন জায়গিরদার


জুন ১৯৭১। মুক্তিবাহিনীর গেরিলারা পাকিস্তানি সৈন্যদের ওপর সফল হামলা শুরু করেছেন। বেশ কয়েক জায়গায় তাদের বেশ ক্ষয়ক্ষতিও করতে সক্ষম হয়েছেন। তবে প্রবাসী বাংলাদেশি সরকারের নেতৃবৃন্দ বুঝতে পারলেন, পাকিস্তান সেনাবাহিনীকে পরাজিত করতে হলে কেবল গেরিলা যুদ্ধই যথেষ্ট নয়।

সম্মুখ যুদ্ধেরও প্রয়োজন আছে। আর তার জন্য প্রয়োজন একটি পূর্ণাঙ্গ সেনাবাহিনীর। ঠিক হলো, গেরিলা যোদ্ধাদের মধ্য থেকে আগ্রহীদের যোগ্যতার ভিত্তিতে সেনাবাহিনীতে নিয়োগ দেওয়া হবে। সৈনিক পাওয়া গেল সহজেই। তাদের প্রশিক্ষণও ছিল সংক্ষিপ্ত। কিন্তু অফিসার? ইস্টবেঙ্গল রেজিমেন্ট ও ইপিআরে থাকা বাঙালি অফিসাররা পর্যাপ্ত নন।

আরো অফিসার প্রয়োজন মুক্তিবাহিনীর জন্য। তাই সিদ্ধান্ত হলো, ৬০ জনকে বাছাই করে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর অফিসার হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হবে।

জুনেই শুরু হলো বাছাই। মুক্তিবাহিনীর বিভিন্ন গেরিলা ক্যাম্প ঘুরে ঘুরে ৬০ জনকে বাছাই করা হলো, যাঁদের সবারই পূর্বে রণাঙ্গনে গেরিলা যুদ্ধের অভিজ্ঞতা ছিল। আর তাঁদের বড় অংশই ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়-ছাত্র।

জুনের ৩০ তারিখ থেকে শুরু হলো প্রশিক্ষণ। শিলিগুড়ির মূর্তি নামক পার্বত্য অঞ্চলে, যার একপাশে ছিল একটি পাহাড়ি নদী ও একটি চা বাগান। তাছাড়া জায়গাটা ছিল জঙ্গলাকীর্ণ। ভারতীয় সেনাবাহিনীর ৩৩ নং কোর ছিল সার্বিক তত্বাবধানে। ব্যাচের নাম দেওয়া হলো “ভাসানী উইং”। কমান্ড্যান্ট নিযুক্ত হলেন ভারতীয় সেনাবাহিনীর ব্রিগেডিয়ার টি.ডি. জোশি। চিফ ইনস্ট্রাক্টর কর্নেল দাশগুপ্ত, সিনিয়র ইনস্ট্রাক্টর মেজর আসমান সিং।

৬০ জনের ব্যাচটিকে চারটি স্কোয়াড্রনে ভাগ করে প্রশিক্ষণ শুরু হলো। প্রশিক্ষণসূচীর মধ্যে ছিল ফায়ারিং, টেকনিক ও ট্যাকটিকস, অপারেশন পরিকল্পনা ও নেতৃত্বের নিয়মকানুন, মহড়া ও ব্যাটল ইনঅকুলেশন (বাস্তব যুদ্ধক্ষেত্রের সাথে পরিচিত করানোর জন্য যুদ্ধের ডেমো) ইত্যাদি। দিনের পাশাপাশি রাতের বেলাও প্রশিক্ষণ চলতো।

ঝুম বৃষ্টিতেও যুদ্ধ করার প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছিল। আর ফায়ারিং দক্ষতার ওপর বিশেষ জোর দেওয়া হয়েছিল বলে ক্যাডেটরা ফায়ারিংয়ে বিশেষভাবে দক্ষ হয়ে ওঠেন। ৩৩ নং কোর কমান্ডার লেফটেন্যান্ট জেনারেল এম.এল. থাপান একাধিকবার প্রশিক্ষণ পরিদর্শনে আসেন। লেফটেন্যান্ট জেনারেল জগজিৎ সিং অরোরাও একবার এসেছিলেন। আর ইস্টবেঙ্গল রেজিমেন্টের বাঙালি অফিসাররা তো নিয়মিতই আসতেন।

প্রশিক্ষণ উঁচুমানের হলেও ক্যাডেটদের খাদ্য ও বাসস্থান খুব ভালো পর্যায়ের ছিল না। খাদ্যতালিকায় বেশিরভাগ সময়ই থাকতো সবজি।

তবে কিছুদিন পরপর ছাগলের মাংস দেওয়া হতো। তাঁরা থাকতেন বাঁশের তৈরি বিছানায়। অবশ্য তা নিয়ে কখনোই তাঁরা মাথা ঘামাননি বা কষ্ট পাননি। তাঁদের মাথায় তখন শুধু দেশকে শত্রুমুক্ত করার চিন্তা।

প্রশিক্ষণে অবশ্য অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনাও ঘটেছে। একবার প্রশিক্ষণ চলাকালীন পাশের জঙ্গল থেকে একদল বন্য হাতি আক্রমণ করেছিল। এছাড়াও সবসময় তাঁদেরকে বাঘ, সাপ ও অন্যান্য বিষাক্ত পোকামাকড়ের ভয়ে তটস্থ থাকতে হতো।

আবার একবার একটা দুর্ঘটনাও ঘটে। মহড়ার সময় ক্যাডেট ওয়ালির অনিচ্ছাকৃত গুলিতে ক্যাডেট নিরঞ্জন গুরুতরভাবে আহত হন।

১৩তম সপ্তাহে পাকিস্তান মিলিটারি একাডেমি থেকে পালিয়ে আসা ক্যাডেট মাহবুব তাঁদের সাথে যোগ দিলে ক্যাডেট সংখ্যা ৬১তে দাঁড়ায়। পরের সপ্তাহে সাইফুল্লাহ খালিদ ও বজলুর রশিদ নামে আরো দুজন এলেও তাঁদেরকে আর অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি, কারন ১৫ সপ্তাহের প্রশিক্ষণ তখন একদম শেষ পর্যায়ে। যদিও প্রথমে প্রশিক্ষণটা আরো লম্বা হওয়ার কথা ছিল। তবে রণাঙ্গনে অফিসারের ঘাটতির কারণে ১৫ সপ্তাহে প্রশিক্ষণ শেষ করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

অবশেষে আসে সেই দিন। ৯ অক্টোবর ১৯৭১। পাসিং আউট প্যারেডের মাধ্যমে প্রথমবারের মতো বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর অফিসার পদে কমিশন লাভ করেন ৬১ জন ক্যাডেট। সোর্ড অব অনার পান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের অনার্সের ছাত্র সাঈদ, যাকে ২ ইস্টবেঙ্গলে পোস্টিং দেওয়া হয়।

এছাড়াও অতিরিক্ত দায়িত্ব হিসেবে তিনি একটি সাবসেক্টরেরও কমান্ডার ছিলেন। কমিশনপ্রাপ্ত সবাই সরাসরি রণাঙ্গনে গিয়ে বিভিন্ন ইউনিটের কমান্ডার হিসেবে যুদ্ধ শুরু করেন। আর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের বড়ছেলে শেখ কামালকে কর্নেল ওসমানীর এডিসি হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়।

পাসিং আউট প্যারেডে অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম, প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ ও সেনাপতি কর্নেল ওসমানীসহ শীর্ষ নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।

বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর প্রথম এই ব্যাচের অফিসারদের মধ্যে সেকেন্ড লেফটেন্যান্ট খন্দকার আজিজুল ইসলাম, সেকেন্ড লেফটেন্যান্ট আশফাকুস সামাদ ও সেকেন্ড লেফটেন্যান্ট কামরুল হাসান সেলিম রণাঙ্গনে অসীম সাহসিকতা প্রদর্শন করে শহীদ হন।

এই প্রথম ব্যাচের অফিসারদের নেতৃত্বেই মুক্তিযুদ্ধের পরবর্তী অনেকগুলো সফল অভিযান পরিচালিত হয়েছে। তাঁরা প্রমাণ করেছিলেন, দেশের প্রতি ভালোবাসা ও বুকভরা সাহস থাকলে স্বল্প প্রশিক্ষণেও প্রতিপক্ষের বুকে কাঁপন ধরানো সম্ভব।

ছবিতে পাসিং আউট প্যারেডে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর প্রথম অফিসার ব্যাচ। সামনের সারিতে সর্ববাঁয়ে বঙ্গবন্ধুপুত্র শেখ কামাল।

মূল আর্টিকেলঃ মেজর (অবঃ) আবুল হোসেন; পিএইচডি, পিএসসি।
সংগ্রহ, অনুবাদ ও পরিমার্জনঃ Ferdous Yusuf
ইউসুফ জুলকারনাইন জায়গিরদার, আসরাফুল ইসলাম আরিফ এর পেইজ থেকে নিয়েছি

,

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *