বিলেতের এখনকার দিনের ঈদ পালন আর আগেকার দিনের ঈদ পালনের মধ্যে ব্যাপক পার্থক্য রয়েছে। সময় বদলেছে, পরিবেশ পরিস্থিতিও বদলেছে। তাই এদেশে আগের যে কোন সময়ের ঈদের চাইতে বর্তমান সময়ের ঈদপর্ব সহ অন্যান্য ধর্মীয় অনুষ্ঠানাদির আয়োজনও বদলেছে।
অথচ এমন এক সময় ছিল যখন এদেশের মানুষ নামাজ, রোজা ঈদ পর্যন্ত পালন করাতো দুরের কথা, কখন ঈদ, কখন রোজা ইত্যাদি আসতো সে খবরটুকু পর্যন্ত সময়মত জানতেন না। দেশ থেকে আসা চিঠিপত্র বা লোকজনের মাধ্যমে তারা এ সমস্ত জানতে পারতেন। কিন্তু তাও আবার সে সমস্ত পর্ব চলে যাওয়ার অনেকদিন পর।

এদেশে অবস্থানরত আমাদের অনেক পূর্ব পুরুষের কাছ থেকে জানা যায়, যে এ সমস্ত ধর্মীয় পর্বগুলি পালন করার নিতান্ত ইচ্ছা থাকলেও সময় সূযোগ বা জানার অভাবে তারা এগুলি পালন করতে পারতেন না। অনেকে আবার দু:খ প্রকাশ করে বলেন, এই নামাজ-রোজা করতে না পারার কারণে দেশেও অনেক সময় তাদের পরিবারবর্গ নানা বিড়ম্বনার সম্মুখীন হতেন।
তাদের পরিবারের আয়োজিত কোন ধর্মীয় পর্বে অনেক সময় মসজিদের ইমামগন আসতে চাইতেন না। বলা হতো- এখানকার রুজি-রোজগার সম্পূর্ণ রূপে হালাল নয়। তারা রীতিমত নামাজ-রোজা করেন না। অধিকন্তু দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে প্রাকৃতিক কার্য্য সম্পাদন করেন। ইত্যাদি, ইত্যাদি।
তবে আজকালকার অবস্থা ভিন্ন। প্রবাসীদের বাড়ী ছাড়া অনুষ্ঠান জমে না, মসজিদ, মাদ্রাসাসহ নানা ধর্মীয় অনুষ্ঠানাদি প্রবাসীদের ছাড়া সম্পন্ন হয় না। এলাকার সামগ্রিক উন্নয়ন মূলত প্রবাসীদের ঘিরেই অনুষ্ঠিত হয়। এ দেশ থেকে চাঁদা তুলে বা ফান্ডরেইজিং করে এ সমস্ত কর্মকান্ডে প্রয়োজনীয় অর্থ যোগান দেয়া হয়ে থাকে। অনেকে দেশ থেকে এখানে এসেও অর্থ সংগ্রহ করে থাকেন।

সে যাই হোক, এদেশে ঈদ পর্বসহ অন্যান্য ধর্মীয় অনুষ্ঠানগুলি পালনের বিষয়গুলি যেন বাংলাদেশের অনুষ্ঠানগুলিকে হার মানিয়ে চলতে শুরু করেছে। যারা বাঙালী পাড়ায় বসবাস করেন তাদের কাছে তো মনে হয় না যে, সুদুর প্রবাসে তারা ঈদ পালন করছেন। মনে হয় দেশেই তা পালন করছেন। মসজিদ ছাড়াও খোলা মাঠে ঈদের নামাজ আদায়, দল বেধে আত্মীয়-স্বজনের বাড়ীতে যাওয়া, বন্ধু-বান্ধবদের সাথে আড্ডা দেয়া, ঈদের শুভেচ্ছা পৌছে দেয়া, কুরবানী দেয়া, ঘরে ঘরে ঈদ উপলক্ষে রান্নার আয়োজন প্রভৃতি যেন কোন অংশেই এ দেশে কম নয়। বরং কোন কোন ক্ষেত্রে মনে হয় এখন দেশের চাইতে এদেশের সবাই এগিয়ে আছেন।
রেডিও, টেলিভিশন ও পত্রপত্রিকায় এ নিয়ে বিশেষ বিশেষ অনুষ্ঠান প্রচারিত ও প্রকাশিত হয়। মুসলমান অধ্যুসিত এলাকার স্কুলগুলিসহ বিভিন্ন কর্মক্ষেত্রে ঈদের বিশেষ ছুটি পালিত হয়। ঈদের শেষে ঈদ পুনর্মিলনী অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। এ সমস্ত অনুষ্ঠানে অনেক নন মুসলিমরাও যোগদান করছে।
এদেশে আমাদের নতুন প্রজন্মের কাছেও ঈদের আনন্দকে নতুন করে পরিচয় করিয়ে দেয়ার প্রয়োজন পড়ে না। তারা নিজেদের মত করে এগুলি পালন করে থাকে। যদিও এ বিষয়ে কিছু কুসংস্কৃতি ইতিপূর্বে পরিলক্ষিত হতো। যেমন, ছেলে-মেয়েরা ঈদের দিন গাড়ীতে করে ঘুরে বেড়ানো, নানা ধরনের বাধ্যযন্ত্র ও গান বাজানো ইত্যাদি। কিন্তু এখন আস্তে আস্তে তা থেকে তারা সরে আসছে। মসজিদ, মাদ্রাসা ও কমিউনিটি সংগঠনগুলো এ ব্যাপারে যতেষ্ঠ ভূমিকা রাখছে। নানা প্রচার মাধ্যমেও এর নেতিবাচক দিকগুলি তুলে ধরা হচ্ছে। পিতামাতারাও এ ব্যাপারে বেশ সতর্ক ভূমিকা পালন করছেন।
ঈদের শুভেচ্ছা বিনিময়ের একটি অন্যতম মাধ্যম হচ্ছে, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম। এর মাধ্যমে ট্রেক্সট করে, ম্যাসেজ দিয়ে, হোয়াটস আপ করে বা ফেইসবুকের মাধ্যমে এগুলি প্রেরণ করা হয়ে থাকে। মোবাইল ফোন ও কম্পিউটারের মধ্যেমে এগুলি করা হয়। ঈদ কার্ডের মাধ্যমে শুভেচ্ছা বিনিময়ের প্রথা যেন বিলুপ্ত হতে চলেছে। তবে দেশে ব্যানার, ফ্যাস্টুন ও বিলবোর্ডের মাধ্যমে ঈদের শুভেচ্ছা বিনিময় ফলাওভাবে প্রচারের ব্যবস্থা থাকলেও এদেশে এর তেমন কোন প্রচলন নেই।
এদেশে ঈদের কুরবানী সাধারণত অর্ডার দিয়েই সম্পন্ন করা হয়ে থাকে। সরাসরি কুরবানী দেয়ার সূযোগ এখনও তেমনভাবে সৃষ্টি হয়নি। হয়তো আগামীতেও তার প্রচলন হবে। আমাদের নতুন প্রজন্মকে এ ব্যাপারে সরাসরি অবগত করতে অনেকে দেশে গিয়ে কুরবানী দিয়ে থাকেন অথবা মোবাইল বা ভিডিওর মাধ্যমে তা এখানে এনে প্রদর্শন করিয়ে থাকেন। এতে তারা বিভিন্ন বিষয় অবগত হয়ে থাকে। সুতরাং ঈরে অনুষ্ঠানিকতা এখন এদেশে সার্বজনিন হয়ে গেছে। প্রবাসীরা এখন আর আগের মত দেশে গিয়ে তা আদায় করার প্রয়োজনীয়তা মনে করেন না।
এদেশের আরেকটি বৈশিষ্ঠ হলো বিভিন্ন দেশের মুসলমানগন একত্রিত হয়ে ঈদের বিভিন্ন পর্বগুলি পালন করা হয়ে থাকে। যা দেশের চাইতে আলাদ্ াএতে এ পর্বগুলির নিয়ম-নীতি বা বৈশিষ্ঠগুলি সবাই আরো ভালভাবে জানার সূযোগ পান। সাথে সাথে সবার মধ্যে ধর্মীয় মূল্যবোধের মাধ্যমে একে অন্যের মধ্যে ভ্রাতৃত্বের বন্ধন সৃস্টি হয়। নতুন প্রজন্মের ছেলে-মেয়েদের ঈদপর্ব পালনে যেন মনে হয় তারা আর ভিন্ন কোন দেশের পরিচয় বহন করে না। তারা একই আত্মার বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে যায়। এ কারেণে মনে হচ্ছে আগামীতে এ ঈদ আর শুধু বাঙালী, পাকিস্তানী, সোমালী বা সৌদি আরবের পরিচয় বহন করবে না। সবই হবে একই সূত্রে গাঁথা
লেখক- সাংবাদিক, কলামিস্ট ও সম্পাদক মাসিক দর্পণ ম্যাগাজিন, লন্ডন।
