প্রবাস বার্তা টোয়েন্টিফোর ডটকম নিউজ ডেস্ক :: বিশ্বনাথ প্রবাসী এডুকেশন ট্রাস্টের নামে এখতিয়ারবহির্ভূত বেআইনীভাবে ৭জনের নামে বাংলাদেশে একটি দলীল সম্পাদন করার পর থেকে বিগত কয়েক বছর ধরে ট্রাস্টে বিশৃঙ্খলা দেখা গিয়েছে । দলিল সম্পাদনের পাশাপাশি অনুমোদন ব্যতিত এবং সংবিধান লঙ্গন করে ট্রাস্টের মূলধন থেকে টাকা উত্তোলন, টাকার হিসেবে মিলিয়ে দিতে ব্যর্থ হয়ে সরকারি কর্মকর্তাকে বেআইনি ঘুষ প্রদানের ব্যাপারে সাবেক এক সভাপতির স্বীকারোক্তি এবং সর্বোচ্চ আদালত হাইকোর্টের রিট ইস্যুর বিষয়টি সদস্যদের কাছে গোপন রেখে আরেকটি কমিটি সিলেকশনের প্রক্রিয়া শুরু নিয়ে ট্রাস্টিদের মধ্যে বিরূপ প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়েছে । এ নিয়ে সাংবাদিক সম্মেলন এবং দেশ বিদেশের বিভিন্ন মিডিয়াতে বিভিন্ন সময়ে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। গত কিছুদিন পূর্বেও ‘বিশ্বনাথ প্রবাসী এডুকেশন ট্রাস্ট: হাইকোর্টের রুল এবং সংগঠনের অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ নিয়ে সদস্যবৃন্দ ও সচেতন উপজেলাবাসীর উদ্বেগ’ সহ বিভিন্ন শিরোনামে সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও চলছে সরব আলোচনা। শুধু তাই নয় এ নিয়ে এখন পর্যন্ত দুটি মামলাও হয়েছে।
সম্প্রতি সিলেটে সহকারী বিশ্বনাথ জজ আদালতে ট্রাস্টের বোর্ড অব ম্যানেজমেন্টের পক্ষ থেকে দায়িত্বশীলদের মাধ্যমে একটি মামলা রুজু করা হয়েছে। ২৯ অক্টোবর ২০২০ তারিখে রুজুকৃত মামলার স্বত্ত্ব মোকদ্দমা নং ৫১/২০২০ । মামলায় বিবাদী হিসেবে রয়েছেন সংগঠনের ট্রাস্টি ১। ফিরোজ খাঁন (পংকী খাঁন) ২। সাজ্জাদুর রহমান ৩। আব্দুর রউফ ৪। আব্দুল ওয়াহিদ ৫। রহমত আলী ৬। মীর্জা আসহাব বেগ এবং ৭। নজরুল ইসলাম।
মামলার আর্জিতে বাদীগণ নিম্নরূপ বর্ণনা করেন: ‘উক্ত ট্রাস্টের সদস্যগণের মধ্যে কয়েকজন ট্রাস্টি মূল সংবিধানের বিপরীতে তাহাদের নিজেদের ইচ্ছা এবং সুবিধাজনক ভাবে একতরফাভাবে একটি ‘বিশ্বনাথ প্রবাসী এডুকেশন ট্রাস্ট” এর সংবিধান নামে বাংলাদেশে একটি সংবিধান রেজিস্টার করিয়াছেন।
উপরোক্ত অবস্থায় বাদীপক্ষ তর্কিত বিশ্বনাথ প্রবাসী এডুকেশন ট্রাস্ট এর সংবিধান ফটোকপি প্রাপ্ত হইয়া দেখিতে পান যে, ট্রাস্টের সাবেক সাধারণ সম্পাদক ৭ নং বিবাদী নজরুল ইসলাম এবং সাবেক চেয়ারম্যান ৬ নং বিবাদী মির্জা আসহাব বেগ সহ ওপর ৫ সদস্য যোগাযোগী মূলে মিলিত হইয়া বিশ্বনাথ প্রবাসী এডুকেশন ট্রাস্ট এর মূল ইংলিশ ভার্সনে লিখিত ১২ জুন ১৯৯৪ সনের লিখিত সংবিধান পরিবর্তন ক্রমে বাংলা ভার্সনে অপর একটি অর্থাৎ নিম্ন প্রকরণ বর্ণিত ‘বিশ্বনাথ প্রবাসী এডুকেশন ট্রাস্ট এর সংবিধান নামে আরো একটি সংবিধান সম্পাদন এবং রেজিষ্টারী করিয়াছেন। বাদীপক্ষ নালিশী/তর্কিত নিম্ন প্রকরণ বর্ণিত সংবিধান পাঠে আরও অবগত হন যে মূল সংবিধানের ধারা ৫ এবং ৬ এর ব্যত্যয় করিয়া জনহিতকর বিপরীতে কাজ করার সিদ্ধান্ত সংযোজন করিয়াছেন।
বিশ্বনাথ প্রবাসী এডুকেশন ট্রাস্ট’ এর মূল সংবিধান (English Version) অনুযায়ী সংবিধান সংশোধন করিতে হইলে সকল ট্রাস্টিগণের মধ্যে সংখ্যাগরিষ্ট ট্রাস্টি কর্তৃক গৃহীত ও অনুমোদিত হইতে হয়। কিন্তু তর্কিত সংবিধান মাত্র ৭ জন ট্রাস্টি সম্পাদন ও রেজিস্ট্রেশন করিয়াছেন যাহা সম্পূর্ণ বেআইনী হয়। মূল সংবিধানের ৭ ধারা অনুযায়ী পরিচালনা পর্ষদ (BOM) বিনিয়োগকৃত মূলধনের বিপরীতে লভ্যাংশ হইতে ৯০% উত্তোলন করিতে পারেন। কিন্তু তৎকালীন পরিচালনা পর্ষদ তথা বিবাদীগণ মূলধন হইতে ৯,৮৫,০০০/ (নয় লক্ষ পঁচাশি হাজার) টাকা বেআইনিভাবে উত্তোলন করিয়াছেন। তাছাড়া বিশ্বনাথ প্রবাসী এডুকেশন ট্রাস্ট নামে বিশ্বনাথ কৃষি ব্যাংক এবং ICB ইসলামিক ব্যাংক বিশ্বনাথ শাখার জমাকৃত অর্থ অন্য ব্যাংকে স্থানান্তরের বিধান সংযোজন করিয়াছেন। তাহা ছাড়া ট্রাস্ট মূলধন তছরুপ করিয়াছেন।
বিবাদীগণ একে অন্যের সহিত যোগাযোগীতে থাকিয়া ‘বিশ্বনাথ প্রবাসী এডুকেশন ট্রাস্ট” এর মহৎ উদ্দেশ্য নষ্ট করার উদ্দেশ্যে এবং ট্রাস্টের অর্থ আত্মসাতের হীন উদ্দেশ্যে বিগত ১৩/১২/২০১৫ ইং তারিখে নিম্ন প্রকরণ বর্ণিত বিশ্বনাথ প্রবাসী এডুকেশন ট্রাস্ট’ এর সংবিধান নামাকরণীয় দলিল সম্পাদন ও রেজিস্ট্রি করিয়াছেন। বাদীপক্ষ তর্কিত সংবিধান পাঠে আরো অবগত হন যে, বাদী, বিবাদীপক্ষ এবং ট্রাস্টের মূলধন এবং ট্রাস্টের স্থায়ী কার্যালয় বিশ্বনাথ উপজেলাধীন থাকা সত্ত্বেও ঐ সংবিধান দলিল সিলেট সদর উপজেলার ভুয়া ঠিকানা দিয়া সিলেট সদর সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে সম্পাদন ও রেজিস্ট্রি করা হইয়াছে। যাহা সম্পূর্ণ আইন বহির্ভূত হয়।
৯। নালিশী/তর্কিত বিশ্বনাথ প্রবাসী এডুকেশন ট্রাস্টের দলিল বহাল থাকিলে বর্ণিত বাদী ট্রাস্টের আর্থিক ক্ষতি হইবে এবং ট্রাস্টের মূল উদ্দেশ্য ব্যাহত হইবে। পরিচালনা পর্ষদ (BOM) এর গত ৬ আগস্ট ২০১৮ ইং সিদ্ধান্তের পর নালিশী সংবিধান দলিল বাতিল করার আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করার জন্য বিবাদীগণকে অনুরোধ করিলে তাহারা বাতিল করিব বলিয়া কালক্ষেপন করিতে থাকেন। পরবর্তীতে পরিচালনা পর্ষদ এর বিগত ২২ মে ২০১৯ ইং তারিখের সিদ্ধান্তের আলোকে অত্র মামলা দায়েরের সিদ্ধান্ত ও অনুমতি গৃহীত হয়। তৎপ্রেক্ষিতে বাদীপক্ষ গত ১৩/১০/২০২০ ইংরেজি তারিখে তর্কিত সংবিধান দলিলের জাবেদা নকল সংগ্রহ করিয়া উক্ত দলিলের বিষয় সঠিকভাবে অবগত হইয়া অত্র মোকদ্দমা দায়ের করেন।
উপরোক্ত বিত্তান্তদি ও অবস্থাদি অত্র মোকদ্দমার কারণ গঠন করিয়াছেন এবং তাহা গত ২২ মে ২০১৯ ইংরেজি এবং ১৩/১০/২০২০ ইংরেজি তারিখে অত্র আদালতের এলাকায় উপজাত হইয়াছে।
অতএব, বাদীপক্ষ প্রার্থনা করেন যে:
(ক) নালিশী নিম্ন প্রকরণ বর্ণিত ‘বিশ্বনাথ প্রবাসী এডুকেশন ট্রাস্ট এর সংবিধান’ নামাকরণীয় দলিল বেআইনী, পন্ড, আইন বহির্ভূত, অকার্যকর এবং তদদ্বারা বাদীপক্ষ তথা ‘বিশ্বনাথ প্রবাসী এডুকেশন ট্রাস্ট’ বাধ্য নয় মর্মে ঘোষণা হওয়ার:
(খ) মাননীয় আদালতের আদেশ বলে সংশ্লিষ্ট সিলেট সদর সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের বালাম বহিতে দলিলটি বাতিল মর্মে নোট হওয়ার আদেশ প্রদান:
(গ) আদালতের ন্যায় বিচারে বাদীগণ অন্য কি আরো যে সকল উপকার পাওয়ার যোগ্য বিবেচিত হন তাহা পাওয়ার:
(ঘ) সর্বাবস্থায় অত্র মোকদ্দমা বাদীগণের অনুকূলে এবং বিবাদীগণের বিরুদ্বে খর্চ সহ ডিক্রী দিতে বিহিতাদেশ হয়।’
এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, গত বছর সেপ্টেম্বরে বিশ্বনাথ প্রবাসী এডুকেশন ট্রাস্টের কার্যক্রম সম্পর্কে দেশের সর্বোচ্চ আদালত হাইকোর্টের মাননীয় বিচারপতি মোহাম্মদ এনায়েতুর রহিম ও বিচারপতি খায়রুল আলমের সমন্বয়ে গঠিত যৌথ বেঞ্চ একটি রুল জারি করেন। রুলে হাইকোর্ট বেঞ্চ ২০১৫ সালে ৭ জনের নামে সম্পাদিত ট্রাষ্টের দলিলের মাধ্যমে বিশ্বনাথ প্রবাসী এডুকেশন ট্রাষ্টের কার্যক্রম কেন বেআইনী হবে না, এই মর্মে কারণ দর্শানোর জন্যে বিবাদীদের প্রতি নোটিশ জারি করেছেন।
আরো উল্লেখ্য যে, বিশ্বনাথ প্রবাসী এডুকেশন ট্রাস্টের সাধারণ সভা বা কার্যকরী কমিটির কোনো সভা না হলেও ট্রাস্টের বিরাজমান সমস্যাসমূহ সমাধানের লক্ষ্যে সভা ও সিদ্ধান্তসমূহ নামে কিছু প্রস্তাবনা সিলেটে দায়েরকৃত মামলার আর্জির সাথে সংযুক্ত করা হয়েছে। অন্যান্য সিদ্ধান্তের পাশাপাশি রেজিস্ট্রেশনকালীন সময়ে খরচ বাবৎ ১০ লক্ষ টাকার ব্যাপারে আর কোনো প্রশ্ন উত্থাপন করা যাবে না বলে সভার একটি সিদ্বান্ত কথা জানানো হয়। তবে ট্রাস্টের মূলধন তছরূপে এ ধরণের সিদ্ধান্তের ব্যাপারে ট্রাস্টিদের মধ্যে ক্ষোভের পাশাপাশি ফৌজদারি বিষয়ে কিছু ট্রাস্টিবৃন্দের আপোষের আইনিভিত্তি নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে । কারণ ট্রাস্টের মূলধন উত্তোলনের ব্যাপারে যেখানে সকল ট্রাস্টিবৃন্দের মধ্যে অধিকাংশের মতামত বাধ্যতামূলক সেখানে ট্রাস্টের প্রায় ১০ লক্ষ টাকা মূলধন তছরুপের বিষয়ে ‘কোনো প্রশ্ন উত্থাপন করা যাবে না’ এটা কতটুকু আইনসম্মত তা এক বিরাট প্রশ্ন? যেকোনো বিষয়ে আপোষ মীমাংসা প্রশংসনীয় কিন্তু ফৌজদারি অপরাধমূলক কর্মকান্ডের ব্যাপারে বিশেষ করে একটা ট্রাস্টের মূলধন তছরুপের ব্যাপারে ‘আর কোনো প্রশ্ন উত্থাপন করা যাবে না’ এ বিষয়টি নিয়ে অনেকেই বিস্মিত ও হতবাক হয়েছেন বলে জানা গিয়েছে।
এছাড়া আগামী কার্যকরী কমিটি ট্রাস্টের সংবিধানে বর্ণিত নির্বাচনের পরিবর্তে ট্রাস্টের কয়েকজন সদস্যদের দ্বারা মনগড়া সিলেকশনের মাধ্যমে গঠনের সংগঠনের সংবিধানবিরোধী একটি সিদ্ধান্তও গৃহীত হয় বলে জানানো হয়। ট্রাস্টিবৃন্দ তাদের সুচিন্তিত মতামত ট্রাস্টের নামে পরিচালিত সোশ্যাল মিডিয়াতে এ নিয়ে তাদের তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ প্রকাশ করেন । যার জন্য আগামী কমিটি গঠন প্রক্রিয়া এখনো সম্পন্ন করা সম্ভব হয় নাই।
দেশের সর্বোচ্চ আদালত হাইকোর্টে ট্রাস্ট নিয়ে একটি মামলা বিচারাধীন থাকা অবস্থায় নিম্ন আদালতে আরেকটি মামলা দায়ের করা হয়েছে । বিষয়গুলো এখন আদালতে বিচারাধীন রয়েছে বিধায় তা আদালতের মাধ্যমে আইনসম্মতভাবে সমাধান হবে বলে ট্রাস্টিবৃন্দ আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন।
