মায়ের মুখে শোনা মুক্তিযুদ্ধ – মরিয়ম চৌধুরী


বয়স যখন ছিল অতি অল্প
সেই থেকে শুনছি মায়ের মুখে ভয়াবহ যুদ্ধের গল্প।

যুদ্ধটা আসলে কি তখনও সেটা তেমন বুঝিনি।
ভাবতাম মা হয়তো বলছেন কোন কল্প কাহিনী।

যুদ্ধের আসল মানে যখন বুঝতে পারলাম,
নিষ্ঠুর ভয়াবহতা মায়ের চোখে অনুভব করলাম।

মায়ের মুখে শুনা নির্মম সেই যুদ্ধ কালীন কথা,
শুনতেই কেঁপে উঠে অন্তরাত্মা!

ভারাক্রান্ত হয়ে শুনি,
কি ভাবে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী
রেখেছিল নজরবন্দি করে
আমার মা,খালা, মামা আর নানী!

কি ভয়ঙ্কর কষ্টদায়ক আতঙ্কময়
হয়ে উঠেছিল উনাদের জীবন,
চারিদিকে শুধু গোলাগুলি আর নিরীহ মানুষের ক্রন্দন।

চারিদিকে ক্রমাগত আতঙ্কজনিত কম্পন,
প্রতিনিয়ত অতন্দ্র এই বুঝি হবে বোমা বিস্ফোরণ।

নিরব নিস্তব্ধ অশ্রু ভরা চোখে
আরো কত গল্প শুনি আমার মায়ের মুখে।
কি করে আমার বীর সাহসী নানী,
এত আতঙ্কের সময়েও মনের সাহস হারাননি।

ভয়ঙ্কর শ্বাসরুদ্ধকর পরিবেশে!
ধৈর্য, সাহস, বুদ্ধিমত্তা আর প্রভুর ওপর প্রবল বিশ্বাসে।
ক্লান্ত-পরিশ্রান্ত নিদ্রাহীন দুটি চোখে
মুক্তির স্বপ্ন দেখে দেখে।

অসাধারণ সাহসিকতার সাথে হানাদার বাহিনীদের নজরবন্দি থেকে
মহীয়সী নানী আমার আগলে রাখেছিলেন গোটা পরিবারকে।

ভয়াবহ ভয়ংকর সেই পরিস্থিতিতে,
নানী নিয়ে বসলেন সবাইকে একই সাথে।
“থাকবে সবাই একই সাথে ছাড়বে না
একে অন্যের হাত কোন অবস্থাতেই।

বিপদের মনে রেখো না কোন সংশয়
মনে রেখো একমাত্র বিশ্বাস, সাহস আর একতাই পারে বিপদকে করতে জয়”

জীবনের শেষ নির্দেশনা দিলেন সবাইকে এটা বলে।
নানি হয়তো জেনে নিয়েছিলেন মৃত্যুর ডাক এসেছে চলে।

কিছুক্ষণের মধ্যেই হেলিকপ্টার থেকে নিক্ষিপ্ত বোমা নিক্ষেপের কারণে,
শহীদ হয়ে যান আমার নানি আর মামা দুজনেই।

তারপরের সময়টা যে কি মর্মান্তিক ভাবে কাটিয়ে ছিলেন উনারা
সেই কষ্টের বিবরণ শুনলে কেঁপে উঠে অন্তর সারা।

নিহত আদরের ছোট ভাই আর
মাকে কাঁধে করে নিয়ে
হেঁটে, হেঁটে অনেক রাস্তা পাড়ি দিয়ে
দাফন  কাজ শেষ করেন নিকটস্থ স্থানে গিয়ে।

কতো তীব্র মর্মান্তিক সময় মা আমার
করেছিলেন পার,
সেইসব আত্মত্যাগের গল্প শুনি যতবার,
অহংকারে বুকটা ভরে উঠে আমার।

পরিশেষে আল্লাহর কাছে করি মোনাজাত,
সকল শহীদদের দান করো জান্নাত।

,

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *