যার তরে হৃদয় কাঁদে নিভৃতে – সারওয়ার চৌধুরী


ক্লাস সিক্সে ফেল করলাম, অংকে ডাবল শুন্য আর ইংরেজিতে ২২, তবে সেবার সবগুলো সাবজেক্টেই ফেল করেছিলাম, অন্যান্য সাবজেক্টের নাম্বারগুলো মনে নেই। বাবা যখন মারা যান তখন আমি দুই বছরের শিশু , ছয়বোন আর দুইভাই সহ আমাদের এত বড় সংসারের হাল এত শক্ত ভাবে আমার সহজ সরল মা কিভাবে ধরেছিলেন সেই ভাবনা টুকু আমাকে সব সময় বিস্মিত করে !
পড়ালেখায় ছিলাম চরম উদাসী, ছয় বছর বয়সে বাড়ি ছাড়া হয়েছি, বাড়ির জন্য, মায়ের জন্য, বাড়ির মুক্ত আকশে উড়ে চলা ফড়িংয়ের মত মুক্ত শৈশবের জন্য মনটা সব সময় আকুলী বিকুলী করত, সুযোগ পেলেই সিলেট থেকে পালিয়ে বাড়িতে চলে যেতাম, একবার নয় কয়েকবার হয়েছে সেটা, তাই পরীক্ষাতে বড় বড় গোল্লা পাওয়া আমার জন্য ছিল অনেকটা নিত্যনৈমিত্তিক বিষয় !
আম্মা কিন্তু কখনোই আমাকে বকাঝকা করেননি, শুধু বলতেন ” ফিরে যেতে, সবুর করতে, আল্লাহ সবার দিন সব সময় একরকম রাখেননা। ” আমেরিকার সাবেক প্রেসিডেন্ট আব্রাহাম লিংকন বলেছিলেন ” যার মা আছে , সে গরীব নয় ! “
পৃথিবীতে সবাই বদলে যেতে পারে কিন্তু মা কখনোই বদলায় না, জীবনের প্রতি পরতে আমি এ চিরন্তন সত্যে গুলোর প্রমাণ পেয়েছি । প্রাথমিক শ্রেনীগুলো বড় বড় গোল্লার পরও শিক্ষা জীবনের পরবর্তী ধাপগুলো ছিল জ্বলমলে, সাতরঙে বর্ণিল।
সেই শৈশব থেকেই ছিলাম দৌড়ের উপর, কখনও সিলেট, কখনও ঢাকা কিংবা ব্রাম্মনবাড়ীয়া, নেত্রকোনা অথবা বর্ডার ক্রস করে এক্কেবারে সোজা ইন্ডিয়া, কখনও মাষ্টারী, কখনও উড়লচন্ডী ব্যবসা — সবশেষে উড়াল মারলাম আমেরিকায়। সংসারী হলাম, জীবনটা অনেকটাই স্হিতি পেল, আম্মাকে নিয়ে আসলাম নিজের কাছে, কিন্তু পড়ন্ত বয়সে আমেরিকার যান্ত্রিকতায় ভরপুর আলোক জ্বলমল জীবন উনাকে আটকে রাখতে পারেনি।
দেশে চলে গেলেন। হঠাৎ একদিন ফোন আসল আম্মা স্ট্রোক করছেন, হাসপাতালে ভর্তি করা হল, সবাইকে ভালভাবে চিনতে পারছেননা, পরের মাসে স্বপরিবারে গিয়ে উনার সাথে ঈদ করার টিকেট অনেক আগেই করে রেখেছিলাম তারপরও অপেক্ষা করার মত ভরসা পাইনি, জরুরী একটা টিকেট কেটে ছুটে গেলাম আম্মার পাশে, আমি যাওয়ার পরই উনি অনেকটা সুস্হ হয়ে উঠলেন, আমকে চিনতে পারলেন, ডাক্তারের পরামর্শে উনাকে বাসায় নিয়ে যাওয়া হল !
যেহেতু পরের মাসে দেশে আসার টিকেট আগেই করেছিলাম তাই আম্মার কাছ থেকে বিদায় নিলাম, কথা দিলাম পরের মাসে বউ বাচ্চা সহ আসছি, আমরা সবাই একসাথে উনাকে নিয়ে দেশে ঈদ করবো, কে জানতো এটাই হবে শেষ বিদায় ? আমি আমার পরিবার সহ দেশে ঠিকই ঈদ করেছি শুধুমাত্র আম্মা ছাড়া !
পরবাসী হওয়ার পর প্রথম বারের মত দেশে ঈদ করলাম যেখানে ছিলেননা আমার সেই দুঃখ কষ্টের দিনে সুখের যোগানদাত্রী, সাহসদাত্রী,পরম মমতাময়ী, আমার প্রিয় আম্মা ! ঈদের নামাজ পড়েই দৌড় দিলাম মায়ের কবর জিয়ারতে, চোখ বুজে মোনাজাত করছি, দেখি আম্মা আমার ঠিক সামনটায় হাসি মুখে দাঁড়িয়ে আছেন, পিনপতন নীরবতা, শান্তিময় একটা বাতাস অনুভব করছি, আমার দুচোখ দিয়ে অশ্রুধারা, আম্মা বলছেন ” কাঁদছো কেন ?
আমি চলে আসলেও মহামুল্যবান কিছু একটা দুনিয়ায় তোমার জন্য রেখে এসেছি, যেটা সবসময় তোমার সাথে থাকবে, সেটি হচ্ছে আমার দোয়া ! ” আমি চোখ খুললাম, না, সামনে তো কেউ নেই !
তবে কি রকম একটা প্রশান্তিময় অনুভব আমকে যেন জড়িয়ে রেখেছে — মা তো এমনই, সারা জীবন যিনি আগলে রাখলেন, একজন সহজ সরল খোদাভীরু মহিলা হয়েও আমরা এতগুলো ভাইবোনকে যেভাবে সম্মানের সাথে বড় করেছেন সেটা যে কত দুঃসহ, দুর্বোধ্য তা আর কেউ উপলব্ধি করতে না পারলেও আমরা সন্তানেরা তো অস্বীকার করতে পারবোনা, সেই মমতাময়ী মা,উনার মৃত্যুর পরও যাতে আমি ভাল থাকতে পারি, উনার সকল সন্তানেরা ভাল থাকতে পারে সেজন্য দোয়া করে গেছেন — আমি ভাল থাকবো, অবশ্যই ভাল থাকবো, ধনে দৌলতে না হলেও মনের দিক থেকে সর্বদা শান্তিতে থাকবো, আর এগুলো শুধু আমার কথা নয়, আমার দৃঢ় বিশ্বাস — কারন আমার মায়ের দোয়া যে আমার সাথে আছে, থাকবে সবসময়।
আজ আম্মা মারা যাওয়ার দুবছর হয়ে গেল, এখনও কাজ শেষে ঘরে ফিরে আসলে অথবা খুব একান্ত মুহূর্তে একা একা বসে থাকলে আম্মার সাথে কথা বলার জন্য মনের অজান্তেই মোবাইলটা হাতে নেই, ডায়াল করতে গিয়েই হোচট খাই, পর মুহুর্তেই উপলব্ধি হয়, যে কন্ঠ শুনার জন্য আমার ভেতরটা ছটফট করছে সেটা তো আর কখনোই শুনা হবেনা, এই অতৃপ্তি তো আর কখনোই মিটবেনা, এটা এমন এক অতৃপ্তিময় হাহাকার, একমাত্র ভোক্তভুগি ছাড়া আর কেউ হৃদয়াঙ্গম করতে সমর্থ হবেনা !
আমার বাবা মা সহ পৃথিবীর সকল বাবা মা ভাল থাকুন, যারা আমাদের ছেড়ে পৃথিবী থেকে বিদায় নিয়েছেন তাদের পরকালীন জীবন যেন পরম শান্তির হয় এটাই হোক আমাদের সকলের একমাত্র কামনা। আমিন।। লেখক:সারওয়ার চৌধুরী যুক্তরাষ্ট্র : নিউইয়র্ক।
, ,

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *