শিক্ষার গুরুত্ব ও আমাদের করণীয় – ম আ মোশতাক


একটি শিশু ভূমিষ্ঠ হওয়ার পর মাতৃকুলে থাকা অবস্থায় বাঁচার তাগিদে ধাপে ধাপে সে শিক্ষাগ্রহণ করে মা বাবার নিকট থেকে। মা – বাবা শিশুকে লালন – পালন করেন। প্রথমে খাওয়া – দাওয়া পরে হাটা ও কথাবার্তা বলতে শিখান। শিশু শিক্ষা প্রথমে ঘর থেকেই শুরু হয়। শিশুকে যখন প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি করা হয়, তখন থেকে শিশুর মন – মানসিকতা বিকাশের শুরু দায়িত্ব শিক্ষকরা পালন করেন। এক্ষেত্রে প্রাথমিক শিক্ষা বা বাল্যশিক্ষার গুরুত্ব অপরিসীম, এর কোন বিকল্প নেই।

বাংলাদেশে সাধারণত পাঁচ-ছয় বছর বয়সে একটা শিশু প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রথম শ্রেণীতে ভর্তি হয় এবং সেখান থেকে সে প্রথমে অক্ষর জ্ঞান লাভ করে। পর্যায়ক্রমে সে প্রাথমিক শিক্ষা সমাপন করে উচ্চ বিদ্যালয়, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়ে সর্বউচ্চ ডিগ্রী অর্জন করে।

১৯৭১ সালে আমার বয়স যখন ছয়, পাঠশালা স্কুলে প্রথম শ্রেণীতে ভর্তি হবো, তখন যুদ্ধ লেগে যাওয়ায় আমার স্কুলে ভর্তি হওয়া সম্ভব হয়নি। যুদ্ধকালীন সময়ে আমরা মীরাবাজারে বাদশা মিয়ার বাড়াটি বাসায় বসবাস করতাম। যুদ্ধ শেষ হয়ে দেশ যখন স্বাধীন হলো, আমরা তখন রায়নগরে চলে গেলাম। পাড়ার নাম ছিল দপ্তরিপাড়া। বাসার নাম ছিল সীমা ভিলা। তিনটি টিন শেডের বাসা ছিল, আমরা মাঝের বাসায় বসবাস করতাম।

এমনিভাবে বিভিন্ন ঘনঘটার মধ্য দিয়ে বাল্যজীবনের দুই তিনটি বছর অতিক্রান্ত হয়। ঘরে শিক্ষক রেখে প্রথম শ্রেণী থেকে তৃতীয় শ্রেণী পর্যন্ত স্কুলের পাঠ্য বই অধ্যয়ন করি। অবশেষে মা – বাবার ইচ্ছায় ১৯৭৫ সালে আমার বহু প্রত্যাশিত স্কুল কিশোরী মোহন সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ে চতুর্থ শ্রেণীতে ভর্তি হই। স্কুলে ভর্তি হওয়ার কিছুদিন পর আমাদের ক্লাসে দু’জন ছাত্রছাত্রী ভর্তি হন। তারা ছিল আমার নিকট আত্মীয় এবং পরবর্তীতে একজনকে আমার জীবনসঙ্গী হিসেবে বেছে নেই। সে হচ্ছে আমার প্রিয়তমা স্ত্রী নানছি বেগম।

পাঠশালায় দুই বছর অধ্যয়নকালে অনেক স্মৃতি মাঝে মধ্যে মনের মণিকোঠায় দোলা দিয়ে ওঠে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য দিক হচ্ছে সম্মিলিতভাবে জাতীয় সঙ্গীত পরিবেশন। বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতা ও স্কুলের ক্লাসে শিক্ষাগ্রহণ ইত্যাদি। যাদের নিকট থেকে শিক্ষাগ্রহণ করে যে সাফল্যের শিখরে আরোহণ করেছি তাদের নাম কৃতজ্ঞতার সাথে সর্বদা স্মরণ করি। তারা হলেন – মান্যবর প্রধান শিক্ষক রফিকুল বর, আব্দুর রউফ, সেন বাবু, গায়ত্রী দাস, মায়া রাণী ধর। আমাদের সহপাঠীদের মধ্যে যাদের নাম মনে আছে তারা হলো – জুলহাস আলী (সায়মন), দেব দুলাল পাল, পংকজ রায়, দেব্রত দে, কামাল উদ্দিন, রঞ্জন চক্রবর্তী, আমির হাসান চৌধুরী, কিশলয় চক্রবর্তী, বিশ্বজিৎ দে, নানছি বেগম, সুপ্তা চক্রবর্তী, জয়শ্রী ঘোষ, নাজনীন বেগম, ওলি বেগম, নাদিয়া বেগম, মাহমুদা বেগম, সুজাতা এদের মধ্যে অনেকে দেশে – বিদেশে প্রতিষ্ঠিত। মেয়েরা বিশেষ করে ঘর – সংসার নিয়ে ব্যস্ত।

যাই হউক এ রচনার শুরুতে বাল্যশিক্ষার গুরুত্ব নিয়ে কিছু আলোচনা করেছি। তাই আবার ফিরে আসি সে আলোচনায়। শিক্ষা মানুষকে ভালো-মন্দের বাছ – বিচার করতে শিখায়। অন্ধত্ব দূর করে এবং জ্ঞানের আলোয় বিকশিত করে জীবনে প্রতিষ্ঠা লাভের সহায়ক হয়।

শিক্ষা ব্যতীত একটি সভ্য সমাজ গঠন করা যায় না, ঠিক তেমনি দেশ ও জাতির উন্নতিও আশা করা যায় না। তুলনামূল্কভাবে আমরা দেখতে পারি, যে দেশ যত বেশি উন্নত হয়েছে তার পিছনে রয়েছে শিক্ষা। শিশুরা যদি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে পড়ালেখায় মনোনিবেশ না করে, তাহলে উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ও কলেজে গিয়ে ভালোভাবে ফলাফল করতে পারে না। এই বাস্তবতার ভুরিভুরি প্রমাণ রয়েছে। উদাহরণ সরূপ বলা যায় আঁটল মাটি নরম থাকা অবস্থায় যে রূপ দেবেন সেই মাটি শুকানোর পর সেই আকৃতি ধারণ করে। তাই শিশুকালের বাল্যশিক্ষা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

আরও দেখা যায়, যারা আজ অর্থনীতি ও রাজনীতিতে বিশেষ অবদান রাখছেন, তাদের সফলতার মূলে রয়েছে শিক্ষা। শিক্ষা যেমনি মানুষের চরিত্র গঠনে বিশেষ ভূমিকা রাখে ঠিক তেমনি শিক্ষিত লোক দ্বারা দেশ ও জাতি উপকৃত হয়।

বাংলাদেশে বর্তমানে নারী ও পুরুষের শিক্ষা ক্ষেত্রে সমধিকার দেওয়ায় এর সুফল আমরা পেতে শুরু করেছি। অদূর ভবিষ্যতে বাংলাদেশের মানুষেরা যদি শিক্ষা অর্জনের সুযোগকে কাজে লাগাতে পারে তাহলে দেশ ও জাতি উন্নতির দিকে এগিয়ে যাবে।

ব্যক্তিগত সাফল্যের জন্য একজন শিক্ষিত মায়ের যেমন প্রয়োজন, ঠিক তেমনি স্কুলের শিক্ষাব্যবস্থার মান উন্নয়ন অপরিহার্য। বিশেষ করে পাঠ্যপুস্তককে ঢালাওভাবে পরিবর্তন করে বাস্তবমুখী পাঠ্যপুস্তক প্রণয়ন, পরিবর্ধন ও সংযোজনের দায়িত্বভার প্রত্যেকটি শিক্ষাবোর্ডের জন্য অপরিহার্য।

প্রকৃত শিক্ষা মানুষকে মানুষের মতো বাঁচতে শিখায় ও সঠিক পথপ্রদর্শন করে। আমাদের বাংলাদেশে শিক্ষাকে মাধ্যমিক শিক্ষা পর্যন্ত বাধ্যতামূলক করা উচিত। পাশাপাশি শিক্ষা ব্যবস্থার সমস্যা লাঘবের জন্য সরকার ও জনগণ একসাথে কাজ করলে দেশ ও জাতির উন্নয়নে বিশেষ সহায়ক ভূমিকা রাখবে।

আমরা যেদিন শুনতে পারব প্রতিটি পরিবারে অন্তত একজন ডিগ্রি অর্জন করেছে, তখন আমি অন্তত হতবাক হব না, কারণ এর চেয়ে সাফল্যের আর কী হতে পারে।

আমাদের মনে রাখতে হবে প্রকৃত শিক্ষা ও বাস্তব সম্মত শিক্ষার গুরুত্ব অপরিসীম। পরিবারের মধ্যে একজন শিক্ষিত হলে সেখান থেকে সন্তান শিক্ষার জন্য অনুপ্রেরণা পাবে এবং তা হবে সন্তানের জন্য সহায়ক শক্তি ও সঠিক দিকনিদের্শনা যা তার জীবনের উন্নতির সোপান হিসেবে কাজ করবে।

আজকের শিশু আগামী দিনের ভবিষ্যৎ। তাই প্রত্যেক শিশুকে জীবনের শিক্ষা দিতে হবে এবং আদর্শ নাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। মনে রাখতে হবে “ঘুমিয়ে আছে শিশুর পিতা সব শিশুদের অন্তরে”। শিক্ষার মাধ্যমে জাগিয়ে তুলতে হবে শিশুর এই পিতাকে।

অনেকের নিকট শিক্ষা একটা সোনার হরিণের ব্যাপার। যার অর্থ আছে সে শিক্ষিত হতে পারছে। তাই অর্থাভাবে অনেকে শিক্ষা অর্জন থেকে বঞ্চিত রয়েছে। এই বাপারে বিভিন্ন সময়ে শিক্ষা কমিশন রিপোর্টে প্রকাশ পায় বিভিন্ন মতবাদ। কিন্তু কার্যক্ষেত্রে তা সাফল্যের মুখ দেখছে না।

আজ আমাদের গভীরভাবে ভাবতে হবে বর্তমান স্কুল কলেজের পাঠ্যবইগুলো বাস্তব সম্মত কিনা।  দেখতে হবে এ শিক্ষাব্যবস্থা মানুষকে সঠিকভাবে গড়ে তুলতে পারছে কি না এবং অর্জিত শিক্ষা জীবনে প্রয়োগ বা ব্যবহার করা যাচ্ছে কি না। বাস্তবসম্মত কি না। দেখতে পারছে কি না এবং অজিত শিক্ষা জীবনে প্রয়োগ বা ব্যবহার করা যাচ্ছে কি না।

সামগ্রিকভাবে বিচার বিবেচনা করলে বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থায় অনেক গলদ রয়েছে। তা বিজ্ঞজন একমত পোষণ করবেন এবং তা এ ক্ষুদ্র পরিসরে আলোচনা করে শেষ করা যাবে না।

পরিশেষে বলতে চাই, বাংলাদেশ সরকারকে শিক্ষার মানউন্নত করত: শিক্ষাব্যবস্থাকে ঢালাওভাবে সাজাতে হবে। বাস্তবধর্মী শিক্ষা ব্যবস্থা গ্রহণ করলে হয়ত আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মরা উপকৃত হবে। পাশাপাশি সবাইকে নজর রাখতে হবে, যাতে তাদের সন্তানরা শিক্ষা অর্জন করে। এজন্য প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত লেখাপড়া করার জন্য সকলকে উৎসাহ প্রদান করতে হবে।

শিক্ষা সম্পর্কে বেজ্ঞামিন ফ্রাংলিন বলেন, “অজ্ঞ হওয়া যত না লজ্জার বিষয় তার চেয়ে বেশি লজ্জার বিষয় শিখতে না চাওয়া”। জ্ঞান অর্জনের প্রথম পদক্ষেপ হচ্ছে, আমরা যে অজ্ঞ তা জেনে নেওয়া। মেক্সিম গোর্কী শিক্ষা সম্পর্কে বলেন “আমার মধ্যে উত্তম বলে যদি কিছু থাকে এর জন্য আমি বইয়ের কাছে ঋণী”। এ ব্যাপারে নেপোলিয়ান বলেন, “তোমরা আমাকে শিক্ষিত একটি মা দাও, আমি তোমাদের সুন্দর একটি জাতি দিব”। ডঃ মুহম্মদ শহীদুল্লাহ বলেন “হে আল্লাহ তুমি আমাকে দীর্ঘজীবী কর, আমি যেন আরও বেশি পড়তে পারি”। হাদিসে ও কোরআনে শিক্ষা ও জ্ঞান অর্জনের ব্যাপারে বহু গুরুত্বারূপ করে বলা হয়েছে, বিদ্যা বেহেশতের পথ আলোকিত করে। ইহা নির্জনে সঙ্গী, মরুভূমিতে সহচর, দুঃখের সময় ও বিপদের মধ্যে আমাদের অটল রাখে, শিক্ষা সমাজের অলংকার স্বরূপ।

যে ব্যক্তি জ্ঞানচর্চা করে সে নিজেকে এবং সৃষ্টি সম্পর্কে জানতে পেরেছে। জ্ঞান অর্জনের জন্য পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে অপর প্রান্ত যাওয়ার কথা বলা হয়েছে। হযরত আলী (রঃ) বলেন, জ্ঞান যত বাড়িতে থাকে, কথা ততো কমিতে থাকে। অজ্ঞতার মত দৈন্য নাই – মূর্খতার মত রোগ নাই ।

শিক্ষা শেষে কর্মসংস্থানের জন্য সরকারকে আরও উদ্যোগী হতে হবে। পাশাপাশি বেসরকারী উদ্যোগে শিক্ষিত জনগোষ্ঠীকে কাজে লাগাবার পদক্ষেপ নিতে হবে। শিক্ষা ও চাকরি এই দুটি বিষয়ের ওপর সমভাবে গুরুত্ব দিলে আমাদের দেশের মানুষের অনেক সমস্যার সমাধান হবে এবং দেশ হবে সমৃদ্ধিশালী। আত্মনির্ভশীল হয়ে উঠবে জাতি। আর এতেই আসবে আমাদের জাতীয় জীবনে সুখ, শান্তি ও সমৃদ্ধি।

অভিবাসন আইন পরামর্শদাতা

ম্যানচেস্টার, যুক্তরাজ্য।

 

, ,

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *