আবুল মিয়া আর জুলেখা বিবি নতুন জীবনের স্বপ্ন নিয়ে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হলো। দুইজনই অর্থনৈতিক ভাবে সচ্ছল। সকাল ৯টা থেকে বিকাল ৫টা পর্যন্ত সরকারি কর্মকর্তা দুজন। অফিসের গাড়ি সকালবেলা এসে নিয়ে যায় । আবার বিকালবেলা পৌঁছে দেয় বাসায়। ঘরের কাজের জন্য রয়েছে দুইজন সাহায্যকারী।
তাদের দাম্পত্য জীবনে নতুন মুখ চলে আসে। মেটারনিটি ছুটির পর জুলেখা চাকরিতে যোগদান করে। ফুটফুটে বাচ্চাকে রেখে যায় আত্মীয়ের কাছে। এইভাবে এক এক করে জন্ম নেয় চারজন সন্তান। বাচ্চাদেরকে শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দেন। আস্তে আস্তে স্কুল জীবন শেষ করে কলেজে পদার্পণ।

কলেজের জীবন শেষ করে বিশ্ববিদ্যালয়ে। সন্তানদের মধ্যে তিনজনের কপালে জুটে যায় ভাল বেতনের চাকরি। সংসারের সব ছোট সন্তানকে পাঠিয়ে দেন উচ্চশিক্ষার জন্য আমেরিকায়। এরমধ্যে দেশের তিনজন সন্তান বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন।
তাদের সংসারেও চলে আসে বছরে বছরে নতুন নতুন মুখ। পুত্ররা একসময় বাবা মাকে ছেড়ে অন্যত্র ভাড়াটিয়া বাসায় চলে যায়। আবুল আর জুলেখা তাদের মনের কষ্ট কাউকে মন খুলে বলতেও পারেনা।
আমেরিকায় অধ্যায়নরত সেই ছেলেকে স্থায়ীভাবে বসবাসের জন্য আমেরিকায় বিয়ে দেয়া হয়। জন্ম সূত্রে আমেরিকান মেয়ের সাথে বিয়ে হলেও অশান্তিতে কেটে যায় কয়েক বৎসর। আইনের ফাঁকফোক খুঁজে এক সময় দাম্পত্য জীবনে নেমে আসে করুন কাহিনী। দুজনের মধ্যে ছাড়াছাড়ি হয়ে যায়।
আবুল আর জুলেখার আত্মীয়-স্বজনের মধ্যে অনেকেই আমেরিকা কানাডা অস্ট্রেলিয়া ইংল্যান্ডে বসবাস করেন। আত্মীয়-স্বজনরা যখন দেশে আসেন লাগেজ ভর্তি জিনিসপত্র নিয়ে। এসব দেখে আবুল আর জুলেখার মাথায় নতুন পোকা জন্ম নেয়। দেশে তিনজন সন্তানের আয় রোজগার ভাল ছিল।
রঙ্গিন স্বপ্নের মধ্যে হাবুডুবু খাচ্ছে জুলেখার আবুল। যদি সন্তানরা বিদেশে পাড়ি দিতে পারে তাহলে অনেক ভাল হবে। জুলেখা আর আবুল ভাড়াটিয়া বাসা থেকে নিজের বাসা হবে আশ্রয়স্থল। এক সময় ইমিগ্রান্ট ভিসায় পরিবার নিয়ে চলে যায় দেশের তিনজন সন্তান বিদেশে। স্বার্থপরের মতো সন্তানরা পরিবার নিয়ে সুখে স্বাচ্ছন্দে জীবন অতিবাহিত করছে বিদেশে।
সন্তানরা যে পিতামাতাকে রেখে এসেছিল নিজে নিজে চলাফেরা করতে। সেই পিতামাতা বয়সের ভারে একসময় চলাফেরা করতে অক্ষম হয়ে যান। সন্তানরা রেখে এসেছিল পিতামাতাকে চাকুরীরত। সেই পিতা মাতা এক সময় চাকুরী থেকে অবসর গ্রহণ করেন। বার্ধক্যজনিত কারণে শরীর অসুস্থ হলে একমাত্র ভরসা ঘরের সাহায্যকারীর উপর।
যখন অসুস্থতার খবর প্রবাসে বসবাসরত সন্তানরা পেয়ে যায়, হাউ হুতাস করে খালি হাতে চলে আসে সন্তানরা। বিদেশের সন্তানরা চাকরি করে। ফ্যামিলি লীভ অফ আবসেন্স দরখাস্ত করে মাস দিনের জন্য দেশে আসে। নির্দিষ্ট একটা সময়ের মধ্যে অশ্রুসিক্ত অবস্থায় সন্তানরা ফিরে আসতে হয় নিজ নিজ দেশে।
সন্তান ছাড়া আবুল আর জুলেখা বারান্দায় রকিং চেয়ারে বসে দুলতে থাকে। আর দেখতে থাকে নীল আকাশের দিকে তাকিয়ে শুধু দীর্ঘশ্বাস ফেলে। নীল আকাশে সূর্য উদয় হয় আবার অস্ত যায়। রাত্রে অন্ধকারে আকাশে তারা গুলো ফুটে উঠে, আবার দেখা যায় তারা গুলো কোথায় যেন হারিয়ে গেছে।
শোবার ঘরে পালঙ্কে শুয়ে বৃদ্ধ জুলেখা আর আবুল ছাদে ঝুলানো ফ্যানের ঠান্ডা বাতাস নিচ্ছে। কিন্তু ফ্যানের ঠান্ডা বাতাসে হৃদয়ের আগুন ঠান্ডা হচ্ছে না।রুমের ছোট ছোট বিদ্যুৎ-বাতির আলোয় আলোকিত হচ্ছে রুম। তারপরও যেন সবকিছু অন্ধকার।
(বিশেষ দ্রষ্টব্য: জুলেখা আর আবুল কাল্পনিক নাম।)
৬ই জুলাই ২০২০ ইং
লস অ্যাঞ্জেলেস
