হারিয়ে যাচ্ছে অনেক কিছু!
যে সময় শহর বা গ্রামে পড়া লেখা করার তেমন সুযোগ ছিল না। তখন পারিবারিক বা সামাজিক মূল্যবোধ ছিল প্রগাঢ়। লেখাপড়ার সুযোগ থাকলেও অনেকে বিভিন্ন কারণে স্কুল-কলেজে যাওয়া অসম্ভব ছিল। বিশেষ করে গ্রামাঞ্চল বা শহরের অনেক পরিবার প্রতিকূল অবস্থার সাথে সংগ্রাম করে উচ্চতর শিক্ষা অথবা পাঠশালার বারান্দা পর্যন্ত গিয়েছেন। যতটুকু হউক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে নিজেকে গড়ার জন্য শিক্ষা পেয়েছেন, এর চেয়ে সামাজিক মূল্যবোধের শিক্ষা এসেছে পরিবার থেকে। আজ ঘরে ঘরে উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত হবার পর ও সামাজিক মূল্যবোধ তলিয়ে যাচ্ছে সাগরের অতলে।
আসুন এ ব্যাপারে আমার দৃষ্টিকোণ থেকে কি হচ্ছে তা নিয়ে লেখা আজকের। এক সময় ভাই বোন সবার পড়াশোনার জন্য একটা টেবিল থাকতো। সবাই গুন গুন করে পড়াশুনাও করত। পড়ার টেবিলে বসে অনেক সময় সাথের কেউ ঘুমিয়ে গেলে ওকে সজাগ করে দিতো। পরিবারের মধ্যে পিঠাপিঠি ভাই বোন হলে অনেক সময় নিজেরা একে অন্যকে সাহায্য করত। কেউ অংক, ইংলিশ, সমাজবিজ্ঞান কোন কিছু না বুঝলে যে বড় সে বুঝাইয়া দিত। ছিল না কোন হিংসা বিদ্বেষ, সব ছিল আমিও মানুষ হব, তুই মানুষ হও।
ধর্মের শিক্ষা বা স্কুল কলেজের শিক্ষার জন্য যখন সন্তানকে মক্তবের হুজুর বা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের হাতে মা- বাবা তুলে দিতেন, তখন বলতেন বাচ্চাকে মানুষের মত মানুষ করার দায়িত্ব আপনার। আরো ও জোর গলায় মা-বাবারা বলে দিতেন সন্তানকে মানুষ করার দায়িত্ব আপনারদের। কোন শিক্ষক বা মক্তবের হুজুর দুষ্টুমির জন্য গায়ে হাত দিলেও মা-বাবারা কোন প্রতিবাদ করতেন না। কারণ প্রথমে হুজুর বা শিক্ষকের কাছে তুলে দিয়েছেন সন্তানকে।
স্কুলে পড়ার সময় পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন করে কিভাবে রাখতে হয় সেটাও শিক্ষকদের দায়িত্ব ছিল। তাই ছাত্র-ছাত্রী, শিক্ষক, শিক্ষিকা সবাই মিলে স্কুলটা পরিষ্কার করে রাখার চেষ্টা করতেন। এমন কি মক্তবে পড়ার সময় নামাজিদের জন্য অজুর পানি সংরক্ষন করে রাখার ব্যবস্থা করতেন। যে মসজিদের সামনে পুকুর ছিল সেই পুকুরের ঘাট গুলো ঘষামাজা করে রাখার জন্য ছোট ছোট বাচ্চারা শ্রম দিতেন। মনে হতো ইহা একটা সুন্দর এবং পবিত্র কাজ। আর যেসব মসজিদে কোন পুকুর নাই, পানি জমা করে রাখার জন্য হুজুর আদেশ দিতেন টিউবওয়েল থেকে পানি তুলে রাখার জন্য। সবাই উৎসাহের সাথে হুজুরের কথা মান্য করে চলত। কিন্তু আজ এসব করার জন্য আজ যদি কেউ আদেশ করে তাহলে তুলকালাম হয়ে যায়।
এক সময় পাড়ার বা বাড়ির মুরব্বি কেউ সামনে দিয়ে হেঁটে গেলে ছোটরা তখন উনাকে অতিক্রম করে যেতে সাহস হত না। যতক্ষণ পর্যন্ত সামনের মুরুব্বী ডানে বা বামে মোড় নেন নাই ততক্ষণ পর্যন্ত পিছনে পিছনে যেতে হতো। চলার পথে বা হাঁটতে গিয়ে কোন গাছের ছোট ডাল পড়ে থাকলে সেটা মুরুব্বি হাতের ছাতা বা লাঠি দিয়ে রাস্তা থেকে সরাইয়ে রাখতেন। উনাদের ভাবনা ছিল জনসাধারণের রাস্তা যদি পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন থাকে, তাহলে পরপারের জীবনের রাস্তা পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন হয়ে থাকবে।
স্কুলের পড়ুয়া বা কলেজের পড়ুয়া এমনকি যারা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যায় নাই ওরা যখন সিগারেট/ধূমপান করলে একটু লুকিয়ে লুকিয়ে করতো। ধূমপান করার পর মুখ ভাল করে পানি দিয়ে কুল্লি করে নিতো। পকেটে করে এলাচির গোটা নিয়ে বাহিরে বের হতো। ধূমপান করলেও কেউ ধরতে পারতো না। এখন তো কেউ যদি বলে ইস মুখ দিয়ে গন্ধ আসতেছে। তখন নিজের ইজ্জতের উপর হামলা হবার সম্ভাবনা অনেক।
এমন কি এক মুরুব্বী আর এক মুরুব্বীকে যখন ছেলে বা মেয়ের অসামাজিক আচরণের কথা বললে হেসে হেসে উড়িয়া দিয়ে দেয়। আমরা কি শুধু উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত করার জন্য ব্যাকুল বাচ্চাদেরকে!
আগেকার দিনে বাপ- চাচা একসাথে বসে আলাপ-আলোচনা করলে সেখানে বাচ্চাদের উপস্থিত থাকা এক ধরনের বেয়াদবি ছিল। যদি মুরব্বিদের পূর্বের অনুমতি নিয়ে থাকলে সেটাও ভিন্ন কথা। এমন কি মা চাচীরা একসাথে বসে আলাপ করার সময় সেখানে উপস্থিত হওয়া বা কান পেতে শুনো ও ছিল অভদ্রতা বেয়াদবি।
বড়দের সামনে চেয়ারে বসে ছোটরা পা নাড়ানো ছিল অভদ্রতা। চেয়ারে বসলে সুন্দর এবং ভদ্রভাবে বসার তালিম দেওয়া হত পরিবার থেকে। ভুলক্রমে হাঁটার পথে কারোর পায়ে পা লেগে গেলে তখন ক্ষমা প্রার্থনা করতো।
আজ কোথায় যেন হেরে যাচ্ছে ফেলে আসা অনেক স্মৃতি। কেন এমন হচ্ছে বা সামাজিক মূল্যবোধের অবক্ষয় থেকে আমরা কি পরিত্রাণ পাওয়ার কি সুযোগ নাই!!
গোলাম কিবরিয়া
লস অ্যাঞ্জেলেস
৬ই নভেম্বর ২০১৯ ইংরেজি।
