প্রিয় জন্মভুমি আধ্যাত্মিক রাজধানী, সিলেট এবং সিলেটের সন্তান যা’রা বিশ্বে যে যেখানে আছেন, আপনারা সর্বস্তরের সকলকে সালাম,আদাব জানিয়ে আমার এই খোলা চিঠি।
আশাকরি আল্লাহর রহমতে ভাল আছেন এবং বিশ্বের এই মহামারীকালীন সময়ে সকলের কুশল কামনা করছি।
হয়তো অনেকেই জানেন বা নুতন জেনারেশনের জানা না-ও থাকতে পারে। আমি কিছু ঐতিহাসিক ব্যাক্তিদের নিয়ে আলোচনা করবো। যাদের কথা আমাদের না জানলে আমাদের অতীত ঐতিহ্যের ঐতিহাসিক অবমাননা করা হবে।
অত্যন্ত দুঃখের সাথে বলতে চাই স্বাধীন সিলেটের স্বাধীনতার জন্য ১৭৮২ সালে বৃটিশ নিযুক্ত কালেক্টর লেফটেন্যান্ট লিন্ডের বরকন্দাজদের সাথে সিলেটের শাহী ঈদগাহ এলাকায় সশস্ত্র যুদ্ধ করে একই সাথে দুই সহোদর শাহাদাত বরণ করেন। তাঁরা সৈয়দ হাদী ( হাদা মিয়া) সৈয়দ মাহদি ( মাদা মিয়া)। তাদের কবরস্থান সিলেট নয়াসড়ক সংলগ্ন একটি টিলায়।
১৯৮৬ সাল সিলেটের ডিসি বরিশালের সন্তান হাবিবুর রহমান সাহেব। এডিসি জেনারেল মুক্তিযোদ্ধা ইসমাইল সাহেব। সময়টি এরশাদ সাহেবের শাসনামল। যেহেতু আমি জাতীয় পার্টির সক্রিয় কর্মী ও জেলাপরিষদের চেয়ারম্যান ও এমপি জনাব মুকিত খান সাহেবের আস্থাভাজন, সেই সূত্রে সিলেট প্রশাসনের কাছাকাছি আসতে হয়েছে বিভিন্ন কারণে ও সময়ে।
একদিন সিলট সার্কিট হাউজে কি একটা উপলক্ষে খাওয়াদাওয়ার পর সিলেটের অতীত নিয়ে কথা শুরু হওয়াতে আমি *হাদা মিয়া মাদা মিয়া* প্রসঙ্গ তুলি। এতে এডিসি জেনারেল জনাব ইসমাইল সাহেব বেশ আগ্রহী হন পুরো বিষয়টা জানতে জনাব মুকিত খান বুঝিয়ে বললেন।
এতে ইসমাইল সাহেব এই দুই শহীদের কবর দেখার আগ্রহ প্রকাশ করলে আমরা নয়াসড়ক সংলগ্ন গোরস্থানে আসি। কিন্তু কবরগুলো অযত্নে পড়ে আছে দেখে, জনাব এডিসি সাহেব পরদিন তাৎক্ষণিক পরিচর্যার ব্যবস্থা নেন। আল্লাহর কাছে দোয়া ভদ্রলোক যেখানেই থাকুন, ভাল থাকাই কাম্য।
এই দুই মহান শহীদদের সাথে আমার পূর্ব পুরুষ পীর আব্দুল আজিজ ও উনার ভাই পীর সরাফত আলীও ছিলেন। ভাগ্যক্রমে তিনিরা বেঁচে যান। ১৩শত শতাব্দীতে হজরত শাহজালাল সিলেট আগমনের সময় আমার পূর্বপুরুষ হযরত শাহ তৈয়ব ছয়লানিও সফরসঙ্গী হয়ে এসেছিলেন।
এরই ধারাবাহিকতায় আমার বংশে পীর, মশায়েখ ও মৌলবীর সংখ্যা বেশী। এবং সুলতানি আমল বা অধুনা মোগল আমলেও আমার বংশীয় পূর্বপুরুষরা অনেক রাজন্য সমীহ পাইতেন এবং সম্ভবতঃ সুযোগ সুবিধাও ভোগ করেছেন।
আমাদের বংশীয় ধারায় কয়েকটি অলিখিত নিয়মের মধ্যে একটি হলো বাধ্যতামূলক পারিবারিকভাবে ইসলামি শিক্ষা নিতে হবে। দ্বিতীয়ত বংশীয় উত্তরপুরুষ সম্মন্ধে জ্ঞান রাখতে হবে। এই দ্বিতীয় নিয়মের কারণেই আমি *হাদা মিয়া ও মাদা মিয়া সম্মন্ধে ওয়াকিবহাল।
দ্বিতীয় কাহিনী জনাব আলকাছ মিয়া নিয়ে। ৪৬ সালে গণভোটের দাবী এবং পাকিস্তানের পক্ষে আন্দোলন করার স্লোগান ছিল “লড়কে লেঙ্গে পাকিস্তান” এই মন্ত্র সফল করতে সিলেট সফরে মৌলানা ভাসানী, জিন্নাহ সহ মুসলিম লীগের সর্বোচ্চ নেতৃবর্গ সিলেট আসেন। এই “লড়কে লেঙ্গে পাকিস্তান” আন্দোলনের পক্ষে সিলেট এসে বঙ্গবন্ধু পনেরো দিন অবস্থান করেছিলেন।
এদিকে হিন্দুস্থানে মুসলমানদের কচুকাটা করছে রায়ট অর্থাৎ সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা চরমে সেখানে চললেও সিলেট মুসলিম সংখ্যা গরিষ্ঠ হওয়া সত্বেও খুনখারাবি তেমন হয় নাই।
যাইহোক এই তুঙ্গে আন্দোলন চলাকালীন সময়ে বীর আলকাছ মিয়া সিলেট কতোয়ালী থানার ফ্লাগ মাস্ট থেকে বৃটিশ ফ্লাগ নামিয়ে পাকিস্তানের ফ্লাগ উড্ডয়ন করার প্রাক্কালে বৃটিশ সিপাহি দ্বারা গুলিবিদ্ধ হয়ে সাথে সাথেই শহীদ হন। সেই আন্দোলন ও আলকাছ মিয়া যদি শহীদ না হতেন। আজ হয়তো মোদীর NRC আতঙ্কে দিনাতিপাত করতে হতো।
ওহে দেশ বিদেশে অবস্থানরত সিলেটবাসী তাদের এই ত্যাগকে স্মরণে রাখতে হবে আমাদের স্বার্থে। আমাদের গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস পরবর্তী প্রজন্মের জন্য।
আসুন আমরা তাদের সৌজন্যে যদি কিছু না করি, একদিন হয়তো আমাদের সিলেটি ভাষার হরফ বা অক্ষর যেভাবে হারিয়ে গেছে এবং যাচ্ছে, ঠিক এই বীরপুরুষদের কথাও বিস্মৃত হয়ে যাবে। তাই এখনো সময় আছে। সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়া হউক।।
