প্রবাস বার্তা টোয়েন্টিফোর ডটকম নিউজ ডেস্ক :: পূর্ব ইউরোপ ও উত্তর এশিয়াজুড়ে বিস্তৃত বিশ্বের বৃহত্তম দেশটির নাম হলো রাশিয়া। এটি বিশ্বের নবম জনবহুল দেশ, যেখানে ২০১৫ সালের হিসাব অনুযায়ী প্রায় সাড়ে ১৪ কোটি মানুষ বাস করে। ১৯২২ থেকে ১৯৯১ সাল পর্যন্ত রাশিয়া ছিল সোভিয়েত ইউনিয়নের সবচেয়ে বড় রাষ্ট্র। তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়ন বর্তমান ১৫টি স্বাধীন রাষ্ট্রের সমষ্টি ছিল। এরমধ্যে ৬টি প্রজাতন্ত্র ছিল মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ।
প্রজাতন্ত্রগুলো হলো- উজবেকিস্তান, তাজিকিস্তান, তুর্কমেনিস্তান, কাজাখিস্তান, কিরগিজস্তান ও আজারবাইজান। দুঃখজনক হলেও সত্য, সেখানে ইসলাম নিষিদ্ধ হয়ে গিয়েছিল এবং মুসলমানদের জীবন চরম সংকীর্ণ হয়ে পড়েছিলো।
এছাড়া আরও ৩টি প্রজাতন্ত্র ইউক্রেন, জর্জিয়া, আর্মেনিয়াও ছিল মুসলমানদের আয়ত্তে। কিন্তু সেগুলোকে এখন আর মুসলমানদের ভূমি হিসেবে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার সুযোগ আমাদের নেই। সোভিয়েত ভেঙে এক সময় রাশিয়া ফেডারেল গড়ে উঠে।
রুশ ফেডারেল ২২টা প্রজাতন্ত্রে বিভক্ত। এর মধ্যে বাশকোরাস্তান, তাতারাস্তান, দাগাস্তান, চেচনিয়া, ইনগুশিটিয়া, উত্তর ককেশাসের কেরাচাই-চারকেশিয়া, কাবারদিনো বালকারিয়া ৭টিই মুসলিম ভূমি। এমনকি সর্বশেষ দখল করা ক্রিমিয়াতেও ইসলামের ইতিহাস খুঁটি পেতে আছে।
ইসলাম প্রথম দাগাস্তান হয়ে আজকের রাশিয়ায় প্রবেশ করে। আর সমগ্র উত্তর ককেশিয়ায় ছড়িয়ে পড়তে শুরু করে। ২১ হিজরি সনে (ইংরেজি ৬৪১ সালে) আবদুর রহমান ইবনে রাবিয়া (রা.) এর নেতৃত্বে মুসলিম সেনাবাহিনী আল-কুদস এর নিয়ন্ত্রণ গ্রহণের পর উত্তর ককেশাসে এসে পৌঁছেছিল।
সেই জেরুজালেম জয়ী সাহাবাদের অভিযানের সাথে সাথে এই অঞ্চলে মুসলমানদের যাত্রা শুরু হয়। পরবর্তীতে উমাইয়া খিলাফতকালে ১১৯ হিজরিতে অর্থাৎ ৭৩৭ খ্রিস্টাব্দে শক্তিশালী খাজির সাম্রাজ্য মুসলিম সেনাবাহিনীর করতলে আসে।
৯২২ সাল নাগাদ ইসলাম হয়ে পড়ে এখানকার সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের ধর্ম। এভাবেই এইসব অঞ্চলে ইসলামের সর্বব্যাপী বিস্তার ঘটে। উত্তর ও পূর্বাংশ বিশেষত সাইবেরিয়া অঞ্চল ইসলামের খুঁটি হয়ে উঠে।
খ্রিস্টীয় ১৫ শতক পর্যন্ত ইসলামি স্বাধীন রাজ্যের অধীনেই ছিল আধুনিক রাশিয়ার বেশিরভাগ অঞ্চল। পতনের শুরু হয় ১৫৫২ সালে তাতারিস্তানের ভোলগা নদীর তীরবর্তী অঞ্চল থেকে রাশান সাম্রাজ্যে কাছে।
কিন্তু মুসলমানরা কখনোই প্রতিরোধ ছেড়ে দেননি। আর ৩০০ বছরের লড়াই শেষে সর্বশেষ বৃহত্তর দাগাস্তানের পতন হয় ১৮৫৯ সালে। কিন্তু প্রতিরোধ আজও অব্যাহত আছে রাশিয়াজুড়ে।
বৃহত্তর যে দাগাস্তানের কথা বলা হচ্ছে, সেটা মূলত দাগাস্তান, চেচনিয়া, ইনগুশিটিয়া এই তিন প্রজাতন্ত্রকে একত্রে মিলিয়ে ধরা হয়েছে। এই তিন প্রজাতন্ত্রের মুসলমানরা ইমাম শামিলের নেতৃত্বে দীর্ঘ ৩৪টি বছর মহান ও বীরোচিত প্রতিরোধ চালিয়ে এসেছিল।
ইমাম শামিলি (২৬ জুন ১৭৯৭ – ৪ ফেব্রুয়ারি ১৮৭১) ছিলেন উত্তর ককেশাস ও দাগেস্তানের মুসলমানদের রাজনৈতিক ও ধর্মীয় নেতা। তিনি ককেশাসের প্রতিরোধ আন্দোলনের অন্যতম সিপাহসালার ছিলেন। অর্ধশত বছর ধরে তিনি প্রতাপশালী জার সম্রাটদের সাথে লড়াই করেছেন।
এক যুদ্ধে তার পাঁজরের তিনটি হাড় কাটা পড়ে। তখন তাকে চারদিক থেকে জার সৈন্যরা ঘিরে ফেলে। অবস্থা বেগতিক দেখে ইমাম শামিলি এক লাফে তিন সারি সৈন্যের মাথার ওপর দিয়ে তার বিখ্যাত ঘোড়ায় চড়ে পালিয়ে যান। এরপর থেকেই তিনি সবার মুখে সিংহ নামে পরিচিত হয়ে যান। তাকে শেরে দাগেস্তানও বলা হয়।
অর্ধশত বছর বীরের মতো লড়াই করে শেষ বয়সে তিনি এক প্রচণ্ড যুদ্ধে খুব অল্প সংখ্যক সৈন্য নিয়ে জার সৈন্যদের কাছে পরাস্ত হন। তাকে আত্মসমর্পণ করতে বলা হলে তিনি বলেন, মুসলমান আল্লাহ ছাড়া আর কারো কাছে আত্মসমর্পণ করে না।
তিনি এক শান্তিচুক্তির মাধ্যমে সম্রাট আলেকজান্ডারের মুখোমুখি হন। সম্রাট তাকে খুব সম্মান করেন। ইমাম শামিলির ইচ্ছানুযায়ী তাকে মদিনায় পাঠিয়ে দেয়া হয়। তিনি পবিত্র শহরেই মৃত্যুবরণ করেন। জান্নাতুল বাকিতে তার কবর রয়েছে।
তখন সময়টা ছিল মন্দ। তামাম জাহানেই মুসলমানদের পতনধ্বনি বেজে উঠেছিলো। হিন্দুস্তান থেকে দাগাস্তান, সিসিলি থেকে সিংকিয়াং সব ভূমিতেই মুসলমানদের পরাজয়ের ডংকা শোনা যাচ্ছিলো।
বিশ্বের অন্যান্য অঞ্চলের মতো এই অঞ্চলও রাশিয়ান সাম্রাজ্যের কাছে পরাজয় বরণ করে চির বীরের জাতি মুসলমানরা। কালের পরিক্রমায় যে রাশান ফেডারেশন বর্তমানে দাঁড়িয়ে আছে, মুসলমানদের প্রতিরোধ আর স্বাধীনতা সংগ্রাম আজও সেখানে অব্যাহত রয়েছে।
মুসলমানরা এখানে জাতিগত নিধনের শিকার, এটা ধর্মীয় দমন আর তুমুল বঞ্চনার কেন্দ্রবিন্দু। এমন কোনও মুসলিম প্রজাতন্ত্র নেই যেখানে রাশিয়া গণহত্যা চালায়নি।
আফসোস! শুধু মুসলমান হওয়ার অপরাধে রাশিয়ায় লক্ষ লক্ষ মানুষকে হত্যা করা হয় এবং অগণিত মা-বোনের সম্ভ্রমহানি করা হয়। নির্মমভাবে হত্যা করা হয় শিশু-কিশোরদেরও।
অথচ সে রাশিয়াই আজ সভ্য পৃথিবীতে মানবতার ফেরিওয়ালা সেজে বসে আছে। হায় সেলুউকাস! হায় মানবতা।
