হাদীস শরীফ বাংলা মর্মবাণী: সময়ের প্রয়োজনীয় একটি বই


মোহাম্মদ মাহমুদুজ্জামান

রাশিয়ার একটি প্রত্যন্ত এলাকার গ্রাম অ্যাস্তাপোভো। সময়টি ২০ ডিসেম্বর ১৯১০ সাল। সেখানকার ছোট রেল স্টেশনটিতে মৃত অবস্থায় পাওয়া যায় শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ সাহিত্যিক হিসেবে বিবেচিত লিও টলস্টয়কে। বিরাশি বছর বয়সী টলস্টয় নিউমোনিয়ায় ভুগে মারা যান।মৃত্যুর সময় এই মহান লেখকের পকেটে একটি বই পাওয়া যায়। সেটি অবশ্য তার নিজের লেখা নয়। বইটি ছিল ১৯০৫ সালে প্রকাশিত একটি হাদিস সংকলন। নাম ‘দি সেয়িংস অফ মুহাম্মদ’। বইটির লেখক ছিলেন বাংলার সন্তান ব্যরিস্টার, স্কলার এবং সমাজকর্মী স্যার আবদুল্লাহ আল মামুন আল সোহরাওয়ার্দী। তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্র্যাজুয়েট ছিলেন। বাংলার প্রভাবশালী রাজনীতিবিদ হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর পূর্বপুরুষ ছিলেন তিনি।

সাম্প্রতিক গবেষণায় জানা যাচ্ছে, বইটি পড়ে ইসলাম সম্পর্কে টলস্টয়ের ধারণা বদলে যায়। এমনকি তার শেষ জীবনের দৃষ্টিভঙ্গিতেও পরিবর্তনের জন্ম দেয়।  ব্যারিস্টার আবদুল্লাহ সোহরাওয়ার্দীর সঙ্গে টলস্টয়ের নিয়মিত চিঠিতে যোগাযোগ প্রতিষ্ঠিত হয়। মহানবী (সা.)-এর বাণী সমৃদ্ধ এই বইটি রুশ ভাষায় অনুবাদের চিন্তাও করছিলেন টলস্টয়!

একটি ছোট বইয়ে কী এমন কথা ছিল যে পৃথিবীর ইতিহাসে অন্যতম বেস্টসেলার লেখকের ভাবনার জগতকে বদলে দিয়েছিল? বাস্তবতা হচ্ছে, হযরত মোহাম্মদ (সা.) এর বাণী এভাবেই যুগে যুগে মানুষকে প্রভাবিত করেছে, অনুপ্রাণিত করেছে। ধর্ম বর্ণ জাতি নির্বিশেষে মানুষকে তা আলোকিত করেছে।

বিভিন্ন সময়ে মানুষ যুগ যন্ত্রণার সমাধান খুঁজতে হাদিসের বাণীর আশ্রয় নিয়েছেন। সময়ের প্রয়োজনে হাদিসের বিভিন্ন অনুবাদে তার ব্যবহার খোঁজার চেষ্টা করেছেন। তুরস্কের সরকার এমন একটি প্রয়োজন মনে করে। তারা দেখে অনেকে কোরআন পড়লেও হাদিসের পাঠক কম। এ কারণে সরকার অনেক স্কলারকে নিয়ে একটি ব্যয়বহুল প্রজেক্ট গ্রহণ করে। তারা ছয় খণ্ডে হাদিস সংকলন প্রকাশ করেন যাতে বর্তমান সময়ের আলোকে সবচেয়ে প্রয়োজনীয় হাদিসগুলো সংকলিত করার চেষ্টা করা হয়। ২০০৩ সালে বইটি প্রকাশিত হয়। যদিও এই উদ্যোগ নিয়ে অনেক আলোচনা সমালোচনা হয়।

দুই.

বাংলা ভাষায় নানা সময়ে বিভিন্ন হাদিসের অনুবাদ বেরিয়েছে। এসব বইয়ে হাদিসের সংকলনের পাশাপাশি নানা ব্যাখ্যাও প্রকাশিত হয়েছে। তবে কিছু ক্ষেত্রে বইগুলোর কলেবর অনেক বড় এবং অনুবাদ সহজ না হওয়ায় অনেকে আগ্রহ হারিয়ে ফেলেন। কোনো কোনো অনুবাদক লেখার সময় সচেতন ভাবে আরবি শব্দের ব্যবহার বাড়িয়ে দেন। যা পাঠককে হাদিস উপলব্ধি করতে সমস্যায় ফেলে দেয়। অনেক অনুবাদের ভীড়ে পাঠকরা কোন বইটি সংগ্রহ করবেন তা বুঝতে পারেন না। এই ধারাবাহিকতার সাম্প্রতিক সংযোজন কোয়ান্টাম ফাউন্ডেশন প্রকাশিত শহীদ আল বোখারী মহাজাতক সংকলিত ‘হাদীস শরীফ: বাংলা মর্মবাণী’।

বইটি হাতে নিয়েই পাঠক প্রথম যে বিষয়টি চোখে পড়ে তা হলো, এতে কোনো বাহুল্য নেই। কোনো ক্যালিগ্রাফি ব্যবহার করা হয় নি। সবুজের মধ্যে সাদায় লেখা হয়েছে ‘হাদীস শরীফ: বাংলা মর্মবাণী’। দূর থেকেই বইটি চোখে পড়ে। লেখক কৃতজ্ঞতা অংশে লিখেছেন, সাহাবা। নবীজীর (স) সহযোদ্ধা। যারা ছিলেন নবীজীর (স) বাণীর ধারক। যারা শান্তি ও সাম্যের বাণী নিয়ে ঘর ছেড়ে ছড়িয়ে পড়েছিলেন দেশ-দেশান্তরে। ….সাহাবার পরের প্রজন্ম তাবেঈন। তার পরের প্রজন্ম তাবে-তাবেঈন। যারা নবীজীর (স) সত্যজ্ঞান ধারণ করে গড়ে তুলেছিলেন এক আলোকোজ্জ্বল সভ্যতা। সত্যানুসন্ধানে যাদের অক্লান্ত মেহনতের ফসল হচ্ছে হাদীসের লিখিত রূপ। তারপর প্রজন্মের পর প্রজন্ম। শতাব্দীর পর শতাব্দী। নিবেদিতপ্রাণ মুহাদ্দিসদের হাদীস জ্ঞানের অংশবিশেষের বাংলা মর্মান্তরই হচ্ছে ‘হাদীস শরীফ বাংলা মর্মবাণী’।

বইটিকে অনুবাদ বা ভাষান্তর না বলে ‘মর্মবাণী’ বলা হয়েছে। লেখক জানাচ্ছেন,

‘হাদীস শরীফ বাংলা মর্মবাণী’ তাঁর [নবীজীর (স)] পবিত্র বাণীর শাব্দিক অনুবাদ নয়, তাঁর কিছু বাণীর বাংলা মর্মান্তর। সহজ সাবলীল এই মর্মান্তর আপনার অন্তরে সৃষ্টি করবে এক অভাবিত অনুরণন। ক্ষণে ক্ষণেই আপনি শিহরিত হবেন আপনার জীবনে এ বাণীর প্রাসঙ্গিকতায়। মনে হবে—আপনাকেই যেন কথাগুলো বলছেন তিনি। তাই পড়া শুরু করুন যে-কোনো পাতা থেকে। ডুবে যান বাক্যের গভীরে। আপনি পাবেন পথের দিশা। জীবন বাঁক বদলাবে। আপনার উত্তরণ ঘটবে উচ্চতর মানবে।

বইটিতে ১২৬৮টি হাদিস সংকলিত হয়েছে। মোট আটটি বিভাগে হাদিসগুলো ভাগ করা হয়েছে। বিভাগগুলো হচ্ছে জীবনদৃষ্টি, দান, ধর্ম, জবাবদিহিতা, কর্ম, পরিবার, জীবনাচার এবং ধর্মাচার। প্রতিটি বিভাগে আবার উপবিভাগ আছে।যেমন নিয়ত, দৃষ্টিভঙ্গি, সালাম, শুকরিয়া, করমর্দন, বিনয়, সাদাকা, এতিমের প্রতি দায়িত্ব, ইসলাম, কোরআন, স্বপ্ন, মৃত্যু, মৃত্যুপথযাত্রীর শেষ কথা, মৃতের প্রশংসা, অহংকার, রাগ, ঈর্ষা ঘৃণা বিদ্বেষ, ছিদ্রান্বেষণ, গীবত, জুয়া বাজি মদ মাদক, অনুশোচনা ও ক্ষমা, ভালোভাবে কাজ, ব্যবসা বাণিজ্য, ভোগ্যপণ্য ও ধনসম্পদ, জায়গা জমি বাড়িঘর, ঋণ, সুদ, মা-বাবা, বিয়ে ও দেনমোহর, স্বামী-স্ত্রী, সন্তান, আত্মীয় প্রতিবেশী, বন্ধুত্ব, অতিথি, নারীর অধিকার, দৈনন্দিন করণীয় বর্জনীয়, খাবার গ্রহণ, ঘুমের প্রস্তুতি, হাঁচি- কাশি,  পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, পোশাক-পরিচ্ছদ, সফর, কারফাসা/ বঙ্গাসন, রোগ নিরাময়, রোগী দেখতে যাওয়া, প্রাণীর সাথে আচরণ, সংশয় বা সন্দেহপূর্ণ কাজ, ওজু, আজান, নামাজ, খেজুর দিয়ে ইফতার, রোজাদারকে আপ্যায়ন, কবর জেয়ারতসহ এমন উপবিভাগ আছে মোট ১২১টি। এক পৃষ্ঠার হাদিস অন্য পৃষ্ঠায় চলমান না হওয়ায় প্রতি পাতাতেই হাদিসগুলো পাঠ করা সম্ভব। এসবের পাশে যোগ হয়েছে মহানবী (সা.)-এর বিদায় হজের মর্মবাণী। যা এক অসাধারণ মানবাধিক সনদ হিসেবে বিবেচিত।

বইটিতে প্রকাশিত প্রতিটি হাদিস মানুষকে আত্মশুদ্ধির পথে নিয়ে যাবে। এর সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো ভাষার সরলতা, সহজবোধ্যতা এবং যথাযথ শব্দের প্রয়োগ। অতি বর্ণনার কোনো স্থান নেই। যার ফলে সহজেই তা হৃদয়ে প্রবেশ করে। একটি উদাহরণ দেয়া যেতে পারে। বোখারী শরিফের প্রথম হাদিসটি নিয়ত নিয়ে। এই হাদিসটি অন্য আরেকটি বইয়ে পরিবেশন করা হয়েছে এভাবে:

‘আলকামা ইব্ন ওয়াক্কাস আল-লায়সী (র) থেকে বর্ণিত, আমি উমর ইবনুল খাত্তাব (রা) কে মিম্বরের ওপর দাঁড়িয়ে বলতে শুনেছি, আমি রাসূলুল্লাহ্ (সাঃ) কে বলতে শুনেছি, “প্রত্যেক কাজ নিয়তের উপর নির্ভর করে, আর মানুষ তার নিয়ত অনুযায়ীই কাজের প্রতিদান পাবে। তাই যার হিজরত হবে দুনিয়াবি কোন লাভের জন্য অথবা কোন নারীকে বিয়ে করার জন্য, তাহলে তার সেই উদ্দেশ্যেই হবে তার হিজরতের প্রাপ্য।”

একই হাদিস মর্মবাণীতে প্রকাশিত হয়েছে এভাবে,

নিয়ত সকল কর্মের অঙ্কুর। প্রত্যেকের কর্মের মূল্যায়ন করা হবে তার নিয়ত বা অভিপ্রায় অনুসারে। কেউ যদি আল্লাহ ও তাঁর রসুলের সন্তুষ্টির জন্যে হিজরত করে, তবে সে সেভাবেই মূল্যায়িত হবে। আর যদি কেউ পার্থিব ধনসম্পত্তি বা কোনো নারীকে পাওয়ার জন্যে হিজরত করে, তবে তার মূল্যায়নও সেভাবেই হবে।

[হিজরত অর্থ দেশত্যাগ। দেশত্যাগী বা শরণার্থীর জীবনে কষ্ট অনেক অর্থাৎ দুনিয়া হোক বা আখেরাত, একজন মানুষ যে উদ্দেশ্যে কষ্টস্বীকার করছে, মূল্যায়নটা হবে সেভাবেই। কষ্ট করার উদ্দেশ্যটাই গুরুত্বপূর্ণ। উম্মে কায়েস নামে এক কুমারীকে বিয়ে করার জন্যে মক্কা থেকে এক যুবক মদিনায় এলে নবীজী (স) একথা বলেন।]
ওমর ইবনে খাত্তাব (রা); বোখারী, মুসলিম

বইটিতে ১২৯ জন হাদিস বর্ণনাকারী সাহাবা, তাবেঈন ও তাবে তাবেঈনের বর্ণিত হাদিস ব্যবহার করা হয়েছে। তাদের সবার নাম ও সংক্ষিপ্ত পরিচয় বইয়ে সংযুক্ত হয়েছে, যা খুবই তথ্যবহুল। ২৭টি উৎস গ্রন্থ এবং ৩১টি রেফারেন্স বইয়ের সাহায্য নেয়া হয়েছে। সবগুলোর সংক্ষিপ্ত বিবরণ দেয়া আছে। একজন পাঠকের কাছে পড়ার সময় বইটিকে কঠিন গবেষণা গ্রন্থ মনে হবে না কিন্তু গবেষণা করার সকল উপকরণই এখানে দেয়া আছে। এটি হাদিস বিষয়ক একটি গাইড বই হিসেবেও কাজ করবে। যা সত্যিই এক অভূতপূর্ব সমন্বয়।

বাংলা ভাষায় এ ধরনের প্রয়োজনীয় হাদিস গ্রন্থ এর আগে আর কখনো প্রকাশিত হয় নি। ইংরেজি ভাষাতেও এমন বই চোখে পড়ে না। তাই এই বইটির একটি ইংরেজি সংস্করণ প্রকাশ করা জরুরি। কেননা সারা পৃথিবীতে ইসলাম নিয়ে যে অপপ্রচার চালানো হচ্ছে তাতে এই রকম বইয়ের যতো বেশি প্রকাশ ঘটবে ততো ভালো। কারণ যোগাযোগের অপূর্ণতার যুগে লিও টলস্টয়ের সময়ে যদি বাংলার একজন হাদিস সংকলনকারীর লেখা বিশ্বখ্যাত লেখকের মনোজগতকে বদলে দিতে পারে তবে বর্তমান বিরতিহীন যোগাযোগের এই যুগে ইওরোপ আমেরিকা অস্ট্রেলিয়াসহ পৃথিবীর লাখো মানুষের জীবনদৃষ্টি বদলে দিতে পারে এই বই।

বইটি পড়ার পর হাদীস শরীফ বাংলা মর্মবাণীর সংকলক ও মর্মান্তরকারী লেখক শহীদ আল বোখারী মহাজাতকের প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে হয় তার অপরিসীম সাধনা, অর্ন্তদৃষ্টি এবং নবী (সা.) এর প্রতি গভীর ভালোবাসার কারণে। যে কাজটি তুরস্কে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় অনেক স্কলার মিলে করেছেন, সেই কাজ নীরবে একা তিনি করেছেন। এর আগে ‘আল কোরআন বাংলা মর্মবাণী’প্রকাশ করে দেশ বিদেশের লাখো পরিবারে তিনি কোরআনের বাণীকে সহজ ভাষায় পৌঁছে দিয়েছেন। যা বাংলা ভাষায় প্রকাশিত কোরআনের ক্ষেত্রে অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করে।

৩৫২ পৃষ্ঠার ‘হাদীস শরীফ: বাংলা মর্মবাণী’ বইটির দাম রাখা হয়েছে ৪০০ টাকা। এখন পাওয়া যাচ্ছে ৩০০ টাকায়।এই রমজানে পরিচিত জনদের মাঝে উপহার দিতে ‘হাদীস শরীফ: বাংলা মর্মবাণী’ হতে পারে সবচেয়ে সেরা এবং প্রয়োজনীয় পছন্দ। বইটি অনলাইনে পাওয়া যাচ্ছে রকমারি ডট কমে। বইয়ের দোকান বাতিঘরসহ কোয়ান্টাম ফাউন্ডেশনের প্রতিটি সেন্টার, শাখা, সেলেও পাওয়া যাচ্ছে। কোয়ান্টাম ফাউন্ডেশনের ওয়েবসাইটে বইটির ফ্রি ডাউনলোড করা সম্ভব। এছাড়া পুরো বইটি কোয়ান্টামের হাদিস অ্যাপেও পড়া যাবে।


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *